গল্প

আঞ্জুমান রোজী’র গল্প || মধ্যাহ্নের সূর্য

জিসান দুর্দান্ত তার্কিক; বাকপটু এক ছেলে। সারাক্ষণ পড়াশোনাতে ডুবে থাকা যার নেশা! লেখালেখিতে সিদ্ধহস্ত! যেকোনো বিষয়ে তার লেখালেখি ছিল প্রশংসাতীত। বামরাজনীতির একজন সক্রিয় কর্মীও সে। পার্টির জন্য নিত্যনতুন চিন্তা-চেতনা নিয়ে গবেষণামূলক লেখায় এবং বক্তৃতায় জিসান ছিল দুর্দান্ত পারঙ্গম। তার সম্মোহনী ক্ষমতায় সবার দৃষ্টি পড়তো খুব সহজে। জীবনের একটাই লক্ষ্য ছিল তার– মানুষের মাঝে সমতা ফিরিয়ে আনা। কোনো বৈষম্য থাকতে পারবে না। সমবণ্টনের রাষ্ট্র; অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের বাস্তবায়ন দেখা ছিল তার প্রাণের স্বপ্ন। তারজন্য জিসান নিবেদিত প্রাণ-মন নিয়ে রাতদিন খেটে কাজও করে যাচ্ছিলো! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় পড়াশুনার পাট চুকিয়ে পুরোদমে সমাজতান্ত্রিক পার্টির জন্য কাজ শুরু করে দেয়।

সমাজতন্ত্রের বিষয়গুলো এবং ধারণাগুলো জিসানকে খুব ভাবাতো। সেই অনুসারে মৌলিকেও বিষয়টা বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যেত। যদিও মৌলি এসবের ধারধারে না। কিন্তু জিসান চাইতো, কেউ একজন তার পাশে বসে তার কথাগুলো মন দিয়ে শুনুক এবং বুদ্ধি পরামর্শের এক আশ্রয়স্থল হোক। অথচ মৌলি ছিল অন্যধাঁচের চিন্তা-চেতনার মানুষ; বলতেগেলে, অনেকটাই রক্ষণশীল। তারপরেও জিসাল হাল ছাড়েনি। নিবিষ্ট চিত্তে সমাজতন্ত্রের বিষয়গুলো বলেই যেত। আর মৌলিও বিরক্তভরা মন নিয়ে কান পেতে বসে থাকতো। জিসান বলতে শুরু করে, “সমাজতন্ত্র এমন একটি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা; যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উৎপাদনের উপকরণে সামাজিক মালিকানা এবং অর্থনীতির একটি সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা।”
মৌলি কথা শুনছে এমন একটা ভাব করে জিজ্ঞেস করে, “তারপর?” জিসান আবার শুরু করে, “একইসঙ্গে এটি একটি রাজনৈতিক মতবাদ এবং আন্দোলনও। যার লক্ষ্য হচ্ছে– এমন একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা; যেখানে সম্পদ ও অর্থের মালিকানা সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন; অর্থাৎ কোনো ব্যক্তিমালিকানা থাকবে না। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনসাধারণের প্রয়োজন অনুসারে পণ্য উৎপাদন হবে এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে একটি দেশের কলকারখানা, খনি, জমি ইত্যাদি সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসেবে পরিগণিত হবে।”
মৌলি হাফ ছেড়ে বলে উঠে, “বাব্বাহ! কী কঠিন বিষয়! সবকিছু মাথার উপর দিয়ে চলে গেলো।” জিসান অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, ” কি বলো, বুঝোনি? শুনো, তাহলে আবার ‘বলছি’। কিছুক্ষণ চুপ থেকে মৌলির দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘বলবো?’ মৌলিও জানে জিসানের কথা মন দিয়ে শুনা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। তাই মাথা এলিয়ে নিরব সম্মতি জানায়। জিসান বলতে শুরু করে,”সমাজতন্ত্র ব্যক্তিগত মালিকানার উৎখাত ঘটায় এবং মানুষে মানুষে শোষণ, অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্বের বিলোপ ঘটায় এবং উন্মুক্ত করে উৎপাদন শক্তির। সমাজতন্ত্রে সামাজিক উৎপাদনের লক্ষ্য হলো; জনগণের সচ্ছলতা বৃদ্ধি ও সমাজের প্রতিটি মানুষের সার্বিক বিকাশ সাধন। অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের মুলনীতি হলো; প্রত্যেকে কাজ করবে তার সামর্থ্য অনুযায়ী এবং প্রত্যেকে গ্রহণ করবে তার প্রয়োজন অনু্যায়ী।” মৌলি হঠাৎ করে হাতপা ঝেড়ে বলে ওঠে, ” আর পারছি না নিতে। মাথা ভারী হয়ে গেছে। চলো অন্য কোথাও যাই।” জিসান হতাশ দৃষ্টিতে মৌলির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়। কোনো কথা না বলে বিফল মনোরথে মৌলির পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করে।

জিসানের স্বপ্ন, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের। এর উপরেই তার বিশ্বাস ছিল প্রবল। ছাত্রজীবন থেকে জিসানের অধ্যাবসায়ের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল এমনই, যা তার আরাধনাও ছিল। লেলিনবাদ, মার্ক্সবাদে আক্রান্ত হয়ে জিসান এমন স্বপ্নে বিভোর থেকে দেশটাকে স্বপ্নরাজ্যে কল্পনা করে যেতো। এই বিষয় নিয়ে জিসান গবেষণামূলক কাজও চালিয়ে যাচ্ছিলো। তার সব লেখাতে এর প্রতিফলন ঘটতো চূড়ান্তভাবে । কিন্তু দিনের পর দিন  জিসানের চিন্তাশক্তিতে ভাটা পড়তে লাগলো।  সময় খুব খারাপ যেতে শুরু করলো।  এমন মানসিকতায় ঘোর লেগেছে যেনো। কোনো এক অমাবস্যা এসে ছেয়ে দিচ্ছে সবকিছু। কোনোকিছুতেই মনটাকে স্থির করতে পারছে না। এক অসহনীয় যন্ত্রণা শরীর, মনকে ঘিরে আছে। জিসানের ভেতর এতদিন যে ইচ্ছাশক্তি প্রবলভাবে কাজ করছিল, তা  আজ ঝিমিয়ে পড়ছে। আত্মবিশ্বাস ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে। যে প্রগতির পথ ধরে এতদিন হেঁটেছিল আজ তা ধীরেধীরে অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? কেন এমন হচ্ছে? আজকাল কিছু উদ্ভট প্রশ্ন জিসানকে অস্থির করে তোলে । সেসব প্রশ্নের কোনো উত্তরও খুঁজে পায় না ।

মৌলিকে পাওয়ার পর থেকেই জিসানের ভেতর বিরাট পরিবর্তন আসে। একধরণের অন্যমনস্কতা জিসানের উপর ভর করে। মৌলি ডানপন্থী ঘরানার মেয়ে। চিন্তা-চেতনায় কিছুটা রক্ষণশীলতা থাকলেও অবলীলায় মিশে যেতে পারতো সকল মতাদর্শের মানুষের সঙ্গে। সাবলীল আচরণে মানুষকে কাছে টানার এক অলৌকিক শক্তি ছিল তার। তার ওপর অপূর্ব সুন্দরী এবং বিদুষী। পিঠে খোলাচুল এলিয়ে, মিষ্টি হেসে আলতো করে ছুটে চলা এক শরতকন্যা। শরতের আকাশের মতই স্বচ্ছ; নীলাম্বরী আদরমাখা তার পুরো মুখোয়বে।
প্রথম দেখাতে জিসান  মৌলির প্রতি মোহগ্রস্থ হয়ে পড়ে। পাবলিক লাইব্রেরির সামনে জটলা পাকানো লোকের ভিড়ে মৌলিকে মনে হচ্ছিলো সদ্যফোঁটা রজনীগন্ধা। সাদা শাড়িতে অপ্সরীর মতো লাগছিল। এতো ভিড়ের মাঝেও অন্যরকম, অন্যরূপা। জিসান আগ বাড়িয়ে কথা বলতে গিয়েও বলেনি। কিছুটা লাজুক প্রকৃতির বলে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল। কিন্তু বুকের ভেতর ঠিকই কাল বৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। কথার ফুলঝুরি চারদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে মৌলি। কী নিয়ে এতো কথা বলছে? জটলা পাকানো মানুষগুলোও খুব মন দিয় শুনছে তার কথা। জিসান কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।  শুধু  দূর থেকে পলকহীন চোখে মৌলিকে দেখতে থাকে। এভাবে  প্রতিদিন মৌলিকে একটু দেখার জন্য পাবলিক লাইব্রেরির সামনে অধীর হয়ে অপেক্ষা করতে শুরু করে । কে মৌলি, কোথাকার মৌলি জিসান তার কিছুই জানে না।
মৌলি আসে বিকেলে বিকেলে। ধীরেধীরে জিসানও বিকেলের কাছে নিজেকে সমর্পন করে দিলো। এমনি করে একদিন জিসানের অপেক্ষার প্রহর ভেঙ্গে  গেলো। মৌলি ধীরেধীরে পা বাড়িয়ে জিসানের কাছে আসে।  তার স্বভাবসুলভ মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে বলে,” আপনি জিসান চৌধুরী! পত্রিকায় আপনার কলামগুল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *