লাইফ স্টাইল

আবদুল হাই মাশরেকীর লেখা গান প্রসঙ্গে || রেজা ফরহাদ

কিছু কিছু লেখকের পরিবারও সেই লেখককে নিয়ে সম্প্রতি তাই করছেন। শত বছরের প্রচলিত গানকে সেই লেখকের নামে চালিয়ে দিচ্ছেন।

সমস্যা হলো মস্তকের চেয়ে মুকুট বড় হলে মুখ ঢেকে যাওয়ার সম্ভাবনাই অধিক। আকর গবেষণা ছাড়া হুটহাট তথ্য ময়দানে ছেড়ে দেয়া বিপদজনক। লেখকের নাম আবদুল হাই মাশরেকী। ১৯৩৮ সালে তিনি ময়মনসিংহ অঞ্চলে দেয়ালিকায় যখন ‘চোর’ গল্প প্রকাশ করেন একই সালে কলিকাতা থেকে গ্রামোফোন কোম্পানি প্রকাশ করে জগদ্বিখ্যাত বাংলা গান ‘ফান্দে পড়িয়া বগা।’ কালের প্রবাহে এই গান তাঁর রচনা বলে এখন প্রচারিত হচ্ছে।

একইভাবে জালাল খাঁ সাহেব রচিত চারটি চরণ ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে’ অবলম্বনে পূর্ণাঙ্গ গানটি সৃষ্টি করেন শিল্পী গিরীণ চক্রবর্তী।’ এখন প্রচারিত হচ্ছে এই গানও মাশরেকী সাহেবের।

মজার ব্যাপার হচ্ছে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত মাশরেকী জীবনীতে তাঁর সঙ্গীত-প্রবেশক অধ্যায়টি পঞ্চাশ দশক থেকে শুরু। লিখেছেন মাহবুব সাদিক। এছাড়া ‘আব্বাসউদ্দিনের গান’ গ্রন্থে কোথাও মাশরেকী সাহেবকে এসব গানের গীতিকার বা সংগ্রাহক হিসেবে উল্লেখ করা হয় নি। ‘ফান্দে পড়িয়া বগা’ গানটি কুচবিহার অঞ্চলের ভাওয়াইয়া গান। বহুকাল আগে থেকেই এই গান সে অঞ্চলে প্রচলিত। আর যিনি ‘ফান্দে পড়িয়া’ গান লিখতে পারেন তাঁর আরো অনেক ভাওয়াইয়া গান থাকার কথা। নজরুলেরও একাধিক ভাওয়াইয়া গান আছে। ‘নদীর নাম সই অঞ্জনা’ ‘পদ্ম দীঘির ধারে লো’ ইত্যাদি।

এর বাইরে ‘মাঝি বাইয়া যাও রে’ ‘আমার গলার হার খুলে লে লো’ গান দুটিও নাকি মাশরেকী সাহেবের রচনা! উইকিপিডিয়াতেও বেশ কিছু তথ্য যোগ করা হয়েছে, যা আবদুল হাই মাশরেকী সাহেবের সাথে বেমানান। তিনি তাঁর সময়ে একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক ছিলেন – একথা অনস্বীকার্য। তবে অতিরিক্ত মহীমা ফিট করতে গিয়ে কালজয়ী অনেকগুলো গান এই লেখকের নামের সাথে জুড়ে দেয়া একেবারেই অনুচিত। আব্বাসউদ্দিন, জসিমউদ্দিন, গিরীণ বাবু প্রমুখের সাথে জীবনচলার পথে তিনি মুখোমুখি হয়েছেন একাধিকবার। এসব যুগোত্তীর্ণ বিপুল জনপ্রিয় গান যদি তাঁর কলম থেকে বের হতো তাহলে তিনি গীতিকবি হিসেবে মীরা দেব বর্মণ, জসিমউদ্দিন, জালাল খাঁ বা উকিল মুন্সীর সম-মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকতেন। আব্বাসউদ্দিনের লেখা ‘আমার শিল্পীজীবনের কথা’ বইতেও মাশরেকীর নাম আসতো। মজার কথা হলো, বাংলা একাডেমি প্রকাশিত মাশরেকী জীবনীতেও এই তথ্যগুলো আসে নি। গবেষক তপন বাগচীও বছর দুয়েক আগে এক প্রবন্ধে গানগুলোর উৎস ও সুরারোপের ইতিহাস নিয়ে আলোকপাত করেছেন।

আবদুল হাই মাশরেকী সাহেব একজন আলোকিত মানুষ। স্বশিক্ষিত মানুষ। বেশী বয়সে [১৯৩৯] এন্ট্রান্স পাশ দিয়ে তিনি আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হয়েও আর পড়েন নি। নিজে মিডিয়া জগতের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। এসব গান যে তাঁর রচনা – এ বিষয়ে নিজের কোন বক্তব্য কোথাও রাখেন নি। গিরীণ চক্রবর্তী বা আব্বাসউদ্দিন সাহেবের কণ্ঠে যার গান বাংলার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছে, সেই গানের গীতিকারের কোন ব্যক্তিগত শ্লাঘা থাকবে না, তা মানা যাচ্ছে না। বাঙালি সমাজ এতোটা নির্লিপ্ত নয় মোটেও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *