গল্প

এক জোছনা পিয়াসী সম্রাটের গল্প|| মির্জ্জা মেহেদী হাসান

ও কারিগর, দয়ার সাগর, ওগো দয়াময়
চান্নি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়।
          কোন এক রাজা, না, রাজা বললে ভুল হবে, কোন এক সম্রাটের এই জগতের কারিগরের কাছে উপরোক্ত লাইন দু’টি ছিল তাঁর আকুল মিনতি । দয়াল কারিগর খুব সম্ভবত সম্রাটের প্রতি খানিকটা এক চোখা ছিলেন বিধায় তিনি যখন যা চেয়েছেন তাঁকে দু”হাত ভরে দিযেছেন। যেমন তাঁর মনে হয়েছে তিনি সেন্ট মার্টিনে প্রাসাদ গড়বেন,যেই কথা সেই কাজ। হয়ে গেল প্রাসাদ সমুদ্র বক্ষে। একবার মনে হল শালবনে তিনি এক নন্দন কানন গড়ে তুলবেন। তাঁর সভাকূলের জ্ঞানী গুণী সভাসদরা ভীষণ মছিবতে পরে গেলেন। শাল বনের ভিতর নন্দন কানন!এত দূরহ কর্ম! কিন্তু হয়ে গেল। তাঁর এই নন্দন কাননে তিনি বুনতে লাগলেন স্বপ্নের জাল। তিনি বৃষ্টি খুব ভালবাসেন। তাই গড়ে তুললেন -বৃষ্টি বিলাস-নামের অনুপম শৈলীর এক স্বপ্ন নিবাস। তাঁর অকাল প্রয়াত কন্যা লীলাবতীর নামে এই নন্দন কাননে খনন করলেন ‘দীঘি লীলাবতী’। হঠাৎ শোনা গেল এই দিঘী থেকে কে যেন মাঝেসাঝে উঠে আসে আর কয়েকটা ভুতও নাকি দিঘীর ধারে আড্ডা দেয়। বাস্,সম্রাটের আকাঙ্খা জাগল তিনি দিঘীর ধারে বসে ভুত দর্শন করবেন। কিন্তু তিনিতো সম্রাট । তিনি তো যেখানে সেখানে বসতে পারেন না। তাই লীলাবতি দিঘীর পাড়ে তৈরী হল বৈঠকখানা । নাম দেয়া হল -ভুত বিলাস। একদিন মনে হল তাঁর নন্দন কাননে তিনি তাঁর মন মত করে কিছু ভাস্কর্য গড়বেন। ডাকা হল ভাস্করকে। হাজার হাজার টাকা খরচ করে গড়া হল অনিন্দ্য সুন্দর কিছু ভাস্কর্য। সবাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু সভ্রাটের পছন্দ হলনা। অসহ্য লাগতে লাগল ভাস্কর্য গুলো। আদেশ দিলেন ওগুলোকে ভেঙ্গে গুঁড়ুগুঁড়ু করে দিতে। দ্রুততার সাথে তামিল হল তাঁর আদেশ ।
উপরে বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী সম্রাট সাহেব একটু হেয়ালী বৈকি। কিন্তু এই সম্রাট শুধু যে শানশওকতের জন্য প্রসিদ্ধ তা নয়। সম্রাট একজন লেখকও বটে। তিনি যাই লেখেন পাঠকরা গোগ্রাসে গিলে। পাঠকরা ঈদের ছুটিতে ট্রেনের টিকিট কাটার মত লাইন ধরে তাঁর বই কেনে। একটি অটোগ্রাফের জন্য মানুষজন এতটাই হুরোহুরি করে যে তাঁর নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশও হিমসিম খায়। প্রকাশকরা সারাদিন ঘুর ঘুর করে একটি পান্ডুলিপি যদি পাওয়া যায়। এই প্রকাশকদের জ্বালায় সম্রাট অস্থির।
একদিন তিনি বাগানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। হঠাৎ করে দুইজন যুবক এসে হাজির । তারা নবীন প্রকাশক হিসেবে পরিচয় দিল। সম্রাটকে একটি পান্ডুলিপি দেয়ার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করল। কিছুতেই ওদেরকে বিদায় করা যাচ্ছিলনা। অবশেষে সম্রাট একটি বুদ্ধি বের করলেন। তিনি ওই যুবকদ্বয়কে বললেন- তোমরা পান্ডুলিপি পাবে বছর দুয়েক পরে। কিন্তু অগ্রীম হিসাবে এখন আমাকে দশ লাখ টাকা দিতে হবে। যুবকদ্বয় মাথা নিচু করে দিয়ে চলে গেল। সম্রাট ভাবলেন -যাক বাঁচা গেল এদের হাত থেকে। পরদিন আবার তাঁর প্রাত্যহিক আড্ডায় তিনি বসলেন। আড্ডা যখন জমে উঠেছে। হঠাৎ দেখেন গতকালের সেই দুই যুবক আবার ঘুরঘুর করছে। এদের একজনের হাতে একটি চটের ব্যাগ। সম্রাট রেগে অস্থির।
আবার তোমরা এখানে। যুবকদের মধ্যে একজন বলল-স্যার আমরা রাজি। পান্ডুলিপি দুই বছরের মধ্যে হলেই হবে। সম্রাট বললেন-বুঝলাম তো। কিন্তু টাকার কি হবে? একজন এগিয়ে এল। চটের ব্যাগটি উপুর করে ধরল। একের পর এক লাখ টাকার বান্ডিল তাঁর সামনে পড়তে লাগল। একে বারে গুনে গুনে দশ লাখ। সম্রাট চুপ। যুবকদের প্রথম জনের নাম জিজ্ঞেস করলেন। যুবক উত্তর দিল-মাজহার। সম্রাট ওদের কাছে টেনে বসালেন। এদের একজন যার নাম মাজহার,সে আমৃত্যু সম্রাটের সবচেয়ে কাছের মানুষ হিসাবে পরিচিত ছিল।
এই সম্রাটের নাম সম্রাট হুমায়ূন। না, তিনি সম্রাট বাবরের পুত্র নন। তিনি ছিলেন একজন নীতিবান পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে। যাঁর বাবা একটি দেশের মুক্তিযুদ্ধের শহীদ বীর সেনানী। যার জন্ম হয়েছিল ভাটি বাংলার রাজধানী খ্যাত নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জের তাঁর মামা বাড়িতে। পরবর্তিতে যিনি পরিচিত ছিলেন বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি উপন্যাসিক, অমর নাট্যকার, নির্মাণের মহান কারিগর হিসাবে । তিনি আমাদের হুমায়ূন আহমেদ।
তাঁর এক সভাসদ ও আরেক জনপ্রিয় লেখক ইমদাদুল হক মিলন এক স্মৃতিচারণে বলেছিলেন- একসময় রবীন্দ্রনাথের মতো কবিতা লিখতেন তাঁর সময়কার এবং পরবর্তীকালের বাঙালি কবিরা, নজরুলকে অনুসরণ করতেন অনেকে, শরৎচন্দ্রের মতো লেখার চেষ্টা করেছেন কোনো কোনো লেখক, সমরেশ বসু ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো লেখার চেষ্টা করেছেন; আর জীবনানন্দের প্রভাব তো তরুণ কবিদের মধ্যে পড়েছিল ব্যাপকভাবে। বাংলা সাহিত্যের এই বড় লেখক-কবিদের মতো প্রভাব বিস্তারকারী লেখক হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন আহমেদের ভঙ্গিতে টিভি নাটক লেখার চেষ্টা করেছেন অনেক তরুণ নাট্যকার। এখনো সমানে করছেন। সংলাপ, অভিনয়ভঙ্গিমা, চরিত্র- সব ফলো করছেন। হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের বিখ্যাত অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ আসাদুজ্জামান নূরকে এখনো অনেকে নাটকের চরিত্রের নামে ডাকে ‘বাকের ভাই’। এই সরকারের আগের সরকারের আমলে রাস্তায় আন্দোলন করার সময় পুলিশ আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীর ওপর লাঠিচার্জ করলেও নূর ভাইয়ের ওপর কখনো করেনি। তাঁর চেহারা দেখেই বলত- আরে, ইনি তো বাকের ভাই। লাঠি তোলা হাত থেমে যেত। হুমায়ূন ভাইয়ের দখিন হাওয়ার ফ্ল্যাটে নূর ভাই এই ঘটনা একদিন বলেছিলেন। সবচেয়ে মজার ঘটনা হলো, হুমায়ূন ভাইয়ের নাটকে নিয়মিত অভিনয় করা দুজন অভিনেতা ব্যক্তিজীবনেও হুমায়ূন ভাইয়ের নাটকের চরিত্রের ভঙ্গিতে কথা বলেন। তাঁদের মৌলিক ভঙ্গিটাই এখন আর নেই। কথা শুনলেই মনে হবে নাটকের চরিত্র দুটো কথা বলছে। তাঁদের হাঁটাচলা, কথা বলা, আচার-আচরণ- সব হয়ে গেছে হুমায়ূন আহমেদের নাটকের চরিত্রের মতো। কতটা ক্ষমতাবান হলে একজন লেখক এই স্তরে পৌঁছান।
পশ্চিম বঙ্গের কিংবদন্তি সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারের স্মৃতি চারণে আমাদের এই সম্রাট এসেছেন বিশেষ মহিমায়। সমরেশ তাঁর সম্পর্কে স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে লিখেছেন-
হুমায়ূনকে আমি প্রথম দেখি একুশের বইমেলায়, সাতাশি সালের এক সন্ধ্যায়। যিনি আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন, ‘‘ইনি হুমায়ূন আহমেদ। ‘এইসব দিনরাত্রি’ নামে একটি জনপ্রিয় টিভি-নাটক লিখেছেন,‘‘ইনি হুমায়ূন আহমেদ। ‘এইসব দিনরাত্রি’ নামে একটি জনপ্রিয় টিভি-নাটক লিখেছেন, ‘শঙ্খনীল কারাগার’ নামের উপন্যাস লিখেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান পড়ান।’’ দেখলাম, একটি শীর্ণ যুবককে, যার পরনে পা়ঞ্জাবি, চোঙা পাজামা গোড়ালির ওপরে। কিন্তু চশমার আড়ালে অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখ। হেসে বলেছিল, ‘‘আমি আপনাদের লেখা পড়ে বড় হয়েছি।’’
সে দিন মেলার দর্শক-শ্রোতারা হুমায়ূনকে ঘিরে ভিড় জমায়নি। রথের মেলায় উদাসীন বালকের মতো বইমেলায় ঘুরছিল সে।
বছর পাঁচেক পরে ঢাকার একুশের বইমেলায় ঢুকেই দেখি বিশাল লাইন। বই হাতে মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। প্রশ্ন করে জানলাম ওঁরা হুমায়ূন আহমেদের বই কিনে দাঁড়িয়ে আছেন অটোগ্রাফ করিয়ে নেবেন বলে। অন্তত পাঁচ-ছ’শো মানুষ একই আগ্রহে অপেক্ষায় আছেন দেখে অবাক হলাম।
আমাদের কলকাতা বইমেলায় এমন ঘটনা ঘটেছে কি না মনে পড়ল না। সমরেশ বসু-শংকর-সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়রা যখন মেলায় আসতেন, তখন তাঁদের ঘিরে ছোটখাট ভিড় জমলেও এমন লাইন পড়ত না।
সময়টা উনিশশো বিরানব্বই। তখনও কলকাতার পাঠকদের নব্বই ভাগ হুমায়ূন আহমেদের নাম শোনেননি, বই পড়া তো দূরের কথা। লাইনের শুরুতে পৌঁছে দেখলাম একটি স্টলের সামনে চেয়ারে বসে হুমায়ূন মাথা নিচু করে একের পর এক সই দিয়ে যাচ্ছে। যে বই এগিয়ে দিচ্ছে তার মুখের দিকে তাকাচ্ছে না।
আমি একটা ‘গীতবিতান’ এগিয়ে ধরতে সে আমাকে না দেখে বইটি নিল। সই করার ঠিক আগে থেমে গিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘‘সর্বনাশ, আপনি কি আমাকে দোজখে পাঠাতে চান? এই বই-এ সই করার যোগ্যতা তো আমার—!’’ বলতে বলতে মুখ তুলেই সে আমাকে দেখতে পেল। তার চোখ বিস্ফারিত হল। লাফিয়ে উঠে আমাকে প্রণাম করতে এল সে। বলল, ‘‘ছি ছি, আপনি আমায় এ কী লজ্জায় ফেললেন!’’
গত পঞ্চাশ বছরে আমি বিখ্যাত, অতি বিখ্যাত অনেক লেখকের সংস্পর্শে ধন্য হয়েছি। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু তাঁর সঙ্গ যাঁরা পেয়েছেন, তাঁদের মুখে ওঁর কথা শুনেছি। ওরকম নির্লোভ, সরল লেখকের সঙ্গে হুমায়ূনের মিল পেয়েছি। মনে রাখতে হবে, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ এবং শরৎচন্দ্রকে বাদ দিলে যে বাংলা সাহিত্য নিয়ে আমরা গর্ব করি, তার সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকের নাম হুমায়ূন আহমেদ। চুরানব্বই সালের একুশের মেলার শেষে শোনা গেল, ওঁর সমস্ত বই এক মেলায় কত কপি বিক্রি হয়েছে, তার হিসেব নেই, তবে নতুন বইগুলোর বিক্রির সংখ্যা পঁচিশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। কলকাতা বইমেলায় যদি কারও দেড়-দু’হাজার বই বিক্রি হয়, তা’হলে তাঁকে আমরা জনপ্রিয় লেখক বলি। হুমায়ূনের সঙ্গে তুলনা করার কথা চিন্তাও করা যায় না।
পাঠক কি ভাবছেন? সমরেশ মজুমদার বলে কথা!
হুমায়ূন আহমেদ তাঁর জন্মভূমি নেত্রকোনাকে হৃদয়ে ধারণ করতেন। তাঁর প্রায় প্রতিটি সামাজিক উপন্যাসে নেত্রকোনার প্রসঙ্গ এসেছে বার বার। নেত্রকোনাকে সারাদেশে পরিচিত করেছেন মূলত হুমায়ূন আহমেদই। শুধু কি তাই?নেত্রকোনার অনেক আঞ্চলিক প্রতিভাকে তিনি জাতীয় ভাবে কিংবদন্তিতে রূপান্তরিত করেছেন। এদের মধ্যে দু’জনের নাম না নিলেই নয়। তাঁরা হলেন যথাক্রমে-আব্দুল কুদ্দুস বয়াতী ও বারী সিদ্দিকী। বংশি বাদক বারী সিদ্দিকীকে তিনি গায়ক বারী সিদ্দিকীতে রূপান্তরিত করেছেন। অনেক ছেলেকে তাঁর ইউনিটে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন। নেত্রকোনার হারিয়ে যাওয়া দুই বাউল রশিদ উদ্দিন ও উকিল মুন্সীকে তিনিই সারা দেশে পরিচিতি দিয়েছেন । তাঁদের গান গুলোকে আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
এত কিছুর পরও হুমায়ূন ছিলেন বড় একা। বিশেষ করে জীবনের শেষ দশকটি তাঁর জন্য জন্য ছিল বেদনা বিধুর । সোনার সংসার ভেঙ্গে যায় এক অচেনা ঝড়ে। কয়েক বছর একাকী কাটাতে হয় দখিন হাওয়া নামক ফ্ল্যাটে। এর কারণ নিয়ে বাঙ্গালীর স্বভাবগত গুজব সৃষ্টি শাওন নামের এক অসম্ভব প্রতিভাবান তরুণীকে নিয়ে।পরবর্তীতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত
যিনি ছিলেন তাঁর প্রিয়তম স্ত্রী। আসলে কি তাই? হুমায়ূনকে নিয়ে যারা গবেষণা করবেন তাদের দিকে চেয়ে থাকলাম। দেখি তারা কী বলেন। কিন্তু আমি এর যথার্থ উত্তর পেয়ে গেছি বহু আগেই। যদি সময় আসে কোন দিন,তখন বলব।
হুমায়ূন আহমেদ পোষাক পরিচ্ছদেই শুধু রাজসিক ছিলেননা। এছাড়া তিনি ভোজনে, আপ্যায়ণে,দানে কোন অংশেই মোঘল সম্রাটদের চেয়ে কম ছিলেন না। যখন যা শখ হত তা মিটাতে ছিলেন বদ্ধ পরিকর। মানুষকে আপ্যায়ণ করতে তিনি খুবই ভালবাসতেন।
হুমায়ূন আহমদের রসবোধ ছিল অসাধারণ । পাখির মুখ দিয়ে –‘তুই রাজাকার বুলি’ বের করে যুদ্ধ অপরাধিদের প্রতি সাধারণ মানুষের মনে ঘৃণা মূলত তিনিই জাগিয়ে তুলেছিলেন। অয়োময়, বহুব্রীহি, কোথাও কেউ নেই প্রভৃতি নাটক ছিল যুগ শ্রেষ্ঠ। তাঁর চলচ্চিত্র গুলোও ছিল ভিন্ন ধারার। সুখ দুঃখ রসবোধ এই সব সবকিছুর উপাদানে সমৃদ্ধ ছিল তাঁর চলচ্চিত্র গুলো।
আর হুমায়ূন আহমেদ কতটা রোমান্টিক ছিলেন তা বলাই বাহুল্য। বর্ষাকাল ছিল তাঁর প্রিয় ঋতু। বৃষ্টি ছিল তাঁর ভীষণ প্রিয়। কতটা রোমান্টিক ও বৃষ্টির প্রতি আসক্তি থাকলে তিনি লিখতে পারেন-
যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো,
চলে এসো এক বরষায় ।।
এসো ঝরঝর বৃষ্টিতে
জল ভরা দৃষ্টিতে,
এসো কোমলো শ্যামলো ছায়
চলে এসো তুমি চলে এসো এক বরষায়।।
যদিও তখন আকাশ থাকবে বৈরী
কদমগুচ্ছ হাতে নিয়ে আমি তৈরি ।।
উতলা আকাশ মেঘে মেঘে হবে কাল
ঝলকে ঝলকে নাচিবে বিজলি আলো
তুমি চলে এসো এক বরষায় ।।
নামিবে আঁধার বেলা ফুরাবার ক্ষণে
মেঘমল্লার বৃষ্টিরও মনে মনে ।।
কদমগুচ্ছ খোপায় জড়ায়ে দিয়ে
জলো ভড়া মাঠে নাচিব তোমায়
নিয়ে চলে এসো তুমি চলে এসো এক বরষায়।।
যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো,
চলে এসো এক বরষায় ।।
ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর হুমায়ূন কিছুটা বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর চলে যাবার সময় হয়েছে। শেষ বার দেশে এসে মায়ের হাতের তার প্রিয় রান্না জিওল মাছের ঝুল খেয়ে গেছেন ও আরোও অনেক শখ তিনি পূরণ করে গেছেন। হাস্যরসের ছলে তিনি তাঁর মৃত্যু পরবর্তি কুলখানির খাবারও খাইয়ে গিয়েছেন তাঁর বন্ধুদেরকে।
বিধাতা শুধুমাত্র একটি কামনাই তাঁর পূরণ করেননি। আর তা হল তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী চান্নি পসর রাইতে তাঁর মৃত্যু হয়নি। জোছনাকে তিনি খুব ভালবাসতেন। জোছনা রাতে তিনি নেশায় বেতাল হয়ে যেতেন। কত গান লিখেছেন এই জোছনাকে নিয়ে! কিন্তু জীবনের শেষ রাতে জোছনা তাঁকে ধরা দেয়নি। হয়তোবা অনন্তকাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *