বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

এফ আর টাওয়ার অগ্নিকাণ্ড এবং বাংলাদেশের স্থাপত্য পরিস্থিতি || তাসলিহা মওলা দিশা

 

আজকাল প্রায়ই ঢাকা শহরে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছে। গতকালও ঘটে গেল আরেকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা। এবং খুব হতাশার সাথে প্রত্যক্ষ করলাম মানুষের অসহায়ত্ব। শুধুমাত্র সঠিক অগ্নি নির্গমন ও নির্বাপন ব্যাবস্থাপনার অভাবে ঝরে গেল পঁচিশটা প্রাণ। আহত হল অর্ধশতাধিক। মানুষের অসহায়ত্ব দেখতে হল নিস্ফল আক্রোশে। কিভাবে লাফিয়ে নামছিল মানুষ। পৃথিবীর কোন দেশে এমন অব্যাবস্থাপনা দেখবেননা আপনি।

যাই হোক, বারবার এমনটা দেখে যাওয়া আর হাহুতাশ করাই কি আমাদের কাজ? একজন স্থপতি হিসেবে কিছু ব্যাপার আপনাদের জানাতে চাইছি। যা কাজে লাগতে পারে। সহজ ভাষায় বলছি, খুব বেশী স্পেসিফিকেশন, মাপ জোক নিয়ে বলবনা। যদিও আমার নিজের জ্ঞানও সীমিত। তবু যতটুকু জানি শেয়ার করলে ক্ষতি তো নেই।

এখানে যে প্ল্যানটা দেখা যাচ্ছে তা এফ আর টাওয়ারের ফ্লোর প্ল্যান। বক্স করে দেয়া জায়গাটা হল fire stair। যা কিনা একেবারে main stair এর পাশেই। আগুন লাগলে শুধু মাত্র office D ছাড়া a,b,c এর মানুষদের মেইন লবি পেরিয়ে তবে ফায়ার স্টেয়ার পর্যন্ত যেতে হবে। যেটা আসলে প্রথমেই জরুরি নির্গমনের শর্ত ভংগ করে। আগুন লাগা অবস্থায় open stair একেবারেই চিমনির কাজ করে। কোন ভাবেই main stair আর fire stair পাশাপাশি রাখা যাবেনা। শুধু তাইনা, fire stair পর্যন্ত যাবার রাস্তা হতে হবে এমন যেখানে আপনাকে আগুন বা ধোঁয়ার কুন্ডলীর মুখোমুখি হতে হবেনা।

আপনার বাসস্থান বা কর্মস্থল থেকে fire stair বা emergency exit পর্যন্ত যাবার যে পথ তাকে বলা হয় fire escape route। এখানে আপনাকে মেইন লবি অতিক্রম করতে হবেনা। যদি এই ছবির মত করে মেইন লবি অতিক্রম করতে হয় তাইলে সেটা কোনভাবেই escape route না। আর fire stair পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তার দৈর্ঘ্য ২৫ মিটার এর বেশী হবেনা। যত দ্রুত সম্ভব মানুষ যেন পৌছতে পারে। সঠিক দিক নির্দেশনা মেইন লবিতে সবসময়ের জন্য দেয়া থাকতে হবে।

Fire stair case এ অবশ্যই fire door থাকতে হবে। কোনভাবেই যেন ধোঁয়া প্রবেশ করতে না পারে। মানুষ যত না আগুনে পুড়ে মরে তার চাইতে বেশী মারা যায় শ্বাসনালীতে বিষাক্ত ধোয়া টেনে নিয়ে। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আগুন ঠেকিয়ে রাখতে পারে এমন মেটেরিয়াল দিয়ে fire door ডিজাইন করতে হয়। Fire Door এর আরও অনেক স্পেসিফিকেশন আছে। ফায়ার এক্সিটের সিঁড়ির প্রস্থ, উচ্চতা, রেলিং এর উচ্চতা, রেলিং কেমন হবে, এমনকি সিঁ্রির মেটেরিয়াল কেমন হবে সে সম্পর্কেও সঠিক দিক নির্দেশনা দেয়া আছে। দশতলার ওপরে হলেই সে বিল্ডিংএর নিজস্ব অগ্নি নির্বাপন ব্যাবস্থার কথা বলা হয়েছে। প্রতি ফ্লোরে ফায়ার হাইড্রেন্ট এর কথা বলা হয়েছে, হোস রিল রাখার কথা বলা হয়েছে, আপতকালিন সময়ের জন্য আলাদা রিজার্ভারের কথা বলা হয়েছে। আমি নিশ্চিত এফ আর টাওয়ারে কোন ব্যাবস্থাই ছিলনা। শুধু এফ আর টাওয়ার কেন, অনেক হাইরাইজেই এসব কোনটিই নেই। আমাদের স্থপ্পতিদের মনে রাখতে হবে Fire Design is a mandatory matter incase of highrise building। ডিজাইন করে টাকা নেয়াই মুখ্য না। আমরা আসলে মানুষের জান নিয়ে কাজ করি। সুতরাং দায় আমরা এড়াতে পারিনা কোনভাবেই।

ফায়ার সার্ভিসের দোষ দিয়ে লাভ নাই। তাঁরা গতকাল যা করেছেন, তা তাঁদের সাধ্যের অতীত। একটা বিল্ডিং এর ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন কাল সমস্ত সিস্টেম ভেঙে দিয়েছে। ঝরে গেছে ২৫ টা তাজা প্রাণ। বস্তুত্নঃ এ শহরে প্রতিদিন মৃত্যুর নিশ্চয়তা নিয়েই আমরা কাজে যাচ্ছি।
আমাদের একটি ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড এর বই আছে। আমরা সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিরা জানি। আমাদের ক্লায়েন্টরা অনেকেই জানেননা। অনেকে জেনেও ক্ষমতার গরমে পাত্তা দেননা।আমার মতে যারা বাড়ি বানাতে চান, অফিস বিল্ডিং বানাতে চান, আমাদের কাছে আসার আগে Bangladesh National Building Code নামের বইটা উলটে fire safety বিষয়ে কি বলা আছে পড়ে আসবেন।

এভাবে প্রতিদিন লাশের মিছিল দেখার জন্য একটা মেগাসিটি বানানোর দরকার নাই। এইটা কোন নগরের criteria fulfill করেনা।
কর্তৃপক্ষের টনক কবে নড়বে আমি জানিনা। বাইশ তলা আসলে কোন হাইটই না যদি সঠিক ভাবে ডিজাইন করা হয়।

অনেকেই বলছে ফায়ার স্টেয়ারের দরজায় তালা লাগানো ছিল। বিশ্বাস করেন, তালা খোলা থাকলেও কোন লাভ হতনা। এটা কোন fire escape ই না। এটা থাকা না থাকা সমান। এটা বাংলাদেশ বলেই এমন জ্ঞান নিয়ে কিছু স্থপতি প্রকৌশলী কাজ করে যাচ্ছেন। উন্নত অনেক দেশ গুলোতে fire safety র বিষয়ে আলাদা পরীক্ষা হয়। পাশ না করলে লাইসেন্সই পায়না। আমাদের তো সেই জবাব্দিহিতা নেই। আই এ বি এর পরীক্ষায় ইমারত নির্মান বিধিমালার সাথে fire safety ও বাধ্যতামূলক করা উচিৎ।

আমি অতি নগন্য একজন মানুষ। সরকারের কাছে করজোড়ে অনুরোধ করছি, ঢাকা শহরের হাইরাইজ ভবন গুলোতে সমীক্ষা চালানো হোক, এবং ত্রুটি সমুহ চিহ্নিত করে retrofitting এর ব্যাবস্থা নেয়া হোক। এবং রাজউক নামের প্রতিষ্ঠানকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হোক। মানুষের জানের নিরাপত্তা দেয়া সরকারের প্রথম দায়িত্ব।
*লেখক একজন স্থপতি এবং ফেসবুক এক্টিভিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *