গল্প

গৌরী সর্ব্ববিদ্যা’র গল্প || হঠাৎ দেখা

আগোরাতে হঠাৎ নিনাদের সাথে দেখা।বয়স বাড়লেও সে আগের মতোই আছে কোন পরিবর্তন নেই।শুধু সামনের চুল কয়েকটা পেকেছে। নাজ প্রথমে খেয়াল করেনি।
দূর থেকে দাঁড়িয়ে সে একদৃষ্টিতে দেখে আছে হঠাৎ নাজের চোখ পড়ে তাঁর দিকে। দুজন চোখাচোখি হবার পর নাজ চোখ সরিয়ে ফেলে।
আগোরা থেকে দরকারি জিনিসপত্র নিয়ে ঘুরে যেতেই দেখে নিনাদ চলে গেছে। দৌড়ে বাইরে গিয়ে খুঁজে। এর মধ্যে সে কোথায় অদৃশ্য হয়ে যায়।

বাসায় গিয়ে তাঁর দেয়া উপহার বই দুইটা বের করে। একটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার বই আরেকটা গল্পের বই। বইটার নাম বুকে চাপা কষ্ট। যে দুইটা বই নাজ খুব যত্ন করে এতোদিন রেখেছে!

প্রায় ত্রিশবছর পর তাঁদের দেখা।নিনাদ ছিল সহজ,সরল ও খুব ভালো মনের একটা ছেলে।নাজ যখন ক্লাস নাইনে পড়ে তখন থেকেই সে তাকে ভালোবাসতে শুরু করে।সন্ধ্যায় বান্ধবীদের সাথে ঘুরতে বের হলে সে তাকে পাহারা দিয়ে রাখতো। স্কুলে গেলে পেছন পেছন যেতো,সবসময় তার খেয়াল রাখতো।

নাজ বুঝতে পারতো তাকে কেও ফলো করছে।চার পাঁচজন একসাথে থাকতো বলে বুঝতে পারতো না কোন ছেলেটা! মাঝে মাঝে খুব রাগ হতো কিন্তু ছেলেটা সাহস করে কোনদিন তাকে কিছু বলেনি! বলেনি বললে ভুল হবে… সে তার ক্ষতি হবে ভেবে তার কাছে কোনদিন তার মনের কথা প্রকাশ করেনি।নাজ এস এস সি তে খুব ভালো রেজাল্ট করে। নতুন কলেজে ভর্তি হয়। তখন তার মন খুব ফুরফুরে। পাখিদের মতো ডানা মেলে উড়তে ইচ্ছে করছে কিন্তু বাবা খুব গরম মানুষ বলে সবসময় নিজেকে সে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করতো।

একদিন নিনাদ নাজকে একটা লম্বা চিঠি লিখে তার বন্ধুকে দিয়ে পাঠায়,চিঠিতে লিখে সে নাজকে খুব ভালোবাসে এবং তাকে বিয়ে করতে চায়।যদি তার মত থাকে, তাহলে তার বাবা মা’র সাথে কথা বলবে। হাতে পেয়ে চিঠিটা খুলে পড়তেই কিভাবে যেন বাবার চোখে পড়ে যায়। সাথে সাথে হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বাবা বড় করে পড়তে থাকে।লজ্জায় মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে নাজ। বাবা প্রশ্নের উপর প্রশ্ন করতে থাকে !

এই ছেলেটা কে! নিনাদ কিভাবে তাকে চেনে,কতদিনের পরিচয়! নাজ সোজা জবাব দেয় আমি ছেলেটাকে চিনি না। কোনদিন দেখিনি তাকে।সাথে সাথে বাবা রেগে গিয়ে বলে ওঠে, মিথ্যে কথা বলবে না। না চিনলে কথা না হলে ছেলেটা এতো সাহস করে কি করে! সত্যি করে বলো !

বাবার কোন কথার জবাব দিতে পারে না। জানে, সত্য বললেও তার কথা বিশ্বাস করবেন না।
বাবা উঁচু গলায় বললেন,কাল থেকে তোমার কলেজে যাওয়া বন্ধ।বিয়ের জন্য প্রস্তুত হও।কথাটা শুনে নাজের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল কারণ সে এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চায় না।

এতোদিন হয়ে যায় অথচ এরমধ্যে কোনদিনও সে নিনাদকে দেখেনি।সে যে তাদের পাড়ার ছেলে সবসময় আশেপাশেই থাকে সেটাও সে জানে না।তবে সে বুঝতে পারতো চার পাঁচজন ছেলের মধ্যে কেউ একজন তাকে ভালোবাসে।

একদিন নিনাদের ছোটবোনকে নাজের বাসায় পাঠিয়ে একটা জায়গায় তার সাথে দেখা করতে বলে।নাজ চিন্তায় পড়ে যায়। কোথায় দেখা করবে! বাবা দেখলে কোনদিনও মেনে নেবেন না। একদিন একদিন করে নিনাদকে ঘুরাতে থাকে নাজ। এর মধ্যে তার বাবা বিয়ের পাত্র দেখা শুরু করে। প্রায় ঠিকঠাক, নাজ ভাবে লুকিয়ে হলেও ছেলেটার সাথে একবার দেখা করা উচিত।জায়গার নাম বলে নাজ গিয়ে ছেলেটার সাথে দেখা করে। নিনাদের মার্জিত কথাবার্তা, লম্বা-চওড়া ফিগার দেখে তার খুব ভালো লেগে যায়। তারপরও বাবা বিয়ের পাত্র ঠিক করে ফেলেছে এখন আর কিছু করার নেই, নিনাদকে সব খুলে বলে যে ওকে বিয়ে করা কোনভাবেই সম্ভব নয়! বাবা যার সাথে বিয়ে ঠিক করবেন তার সাথেই বিয়ে হবে।

নিনাদ বলেছিল পালিয়ে বিয়ে করতে।নাজ তাতেও রাজি হয়নি!
ভারাক্রান্ত মন নিয়ে নিনাদ চলে যায়।কিছুদিন পর তার বোনকে দিয়ে দুইটা গল্পের বই পাঠায়, সেই বইতে লেখা থাকে আমি তোমাকে ভীষণভাবে চেয়েছিলাম জানি না আর কোন মেয়েকে ভালোবাসতে পারবো কিনা! তুমি অন্যঘরে গিয়ে কখনো সুখী হতে পারবে না !
নাজের খুব খারাপ লাগে কিন্তু সাহস করে কিছুই করতে পারে না। কিছুদিন পর বাবার দেখা ছেলের সাথে বিয়ে হয় এবং সুখে সংসার করতে থাকে। এখন তার দুইছেলে এক মেয়ে নিয়ে সুখী পরিবার।ঐদিন মেয়ে সাথে ছিল বলে তার সাথে কথা বলতে পারেনি।পরে অনেকবার গিয়ে আগোরায় খুঁজেছে,কোনদিন আর দেখা হয়নি!

বাবা-মার বাধ্য মেয়েরা সবসময় নিজের সার্থকেই বিসর্জন দেয়! নাজও তাই করেছে! বিয়ের পর নিনাদের কথা বারবার মনে পড়তো।
যতই হোক প্রথম প্রেম….. ভোলা যায়?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *