গল্প

নাসরিন সিমি’র গল্প || সেগুন কাঠের চেয়ার

ঢাকা শহরের অভিজাত আবাসিক এলাকায় নিজের বাড়িতে বসবাস করেন চৌধুরি ইমতিয়াজ আহমেদ। তার চার সন্তানের মধ্যে তিন ছেলে ও এক মেয়ে। স্ত্রী মিসেস নীলা চৌধুরি একটা বেসরকারি ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। চৌধুরি ইমতিয়াজ আহমেদ বেশ কয়েক বছর আগেই অবসরে গেছেন। সরকারি চাকরিতে তিনি বেশ সুনামের সাথে তার জীবন পার করেছেন। সচিবালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোন সম্পদ গড়ে তোলেননি চৌধুরি সাহেব।
এ নিয়ে প্রথম প্রথম তার স্ত্রীর একটু উষ্মা প্রকাশ করতেন কিন্তু স্বামীর দৃঢ়তার কাছে হার মেনে সব মেনে নিয়েছিলেন।
চৌধুরি ইমতিয়াজ আহমেদ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলতে পারেননি। সারাজীবন সৎভাবে থাকতে চেষ্টা করেছেন। সরকারি গাড়ি সরকারি কাজের বাইরে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করেছেন খুব কম।
অফিসে এর জন্য তার সুনাম ছিল। সবাই তাকে শ্রদ্ধা করতো আন্তরিক ভাবেই। কিন্তু সাংসারিক জীবনে তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের কাছে শ্রদ্ধার মানুষ হিসেবে ভালবাসা পেয়েছেন কম।
সাধারণ জীবন যাপনের জন্য ছেলে মেয়েরা কখনো তার বন্ধুদের বাসায় আনতোনা বাবার রাগী মেজাজের দোহাই দিয়ে। তার বদলে তারা ফাস্টফুডের দোকানে বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে একত্রে খাওয়া দাওয়া করতো।
আসলে চৌধুরি ইমতিয়াজ আহমেদ এর বাড়িঘরের আসবাবপত্র ছিল পুরনো দিনের । তার বাবা দাদার আমলের কাঠের তৈরি পুরানো চেয়ার টেবিল খাট পালঙ্ক আলমারি । আর তাদের বাড়িটা দোতলা। তারা উপরের তলায় থাকে আর নীচের অংশটা ভাড়া দেয়া। ভাড়াটিয়া বাড়ির নিচে অনুমতি নিয়ে একটা ছোটখাটো বিউটি পার্লার কাম বাসা হিসেবে ব্যবহার করে। চৌধুরি সাহেবের আপত্তি ছিল এতে কিন্তু তার স্ত্রীর জন্য শেষ পর্যন্ত রাজি হতে হলো। বাসার মধ্যে পার্লার থাকলে তাদের রূপচর্চার খরচ অনেকখানি কমে যাবে সে হিসাব কষে দেখে শুনে তাই বাড়ির নীচের তলাটা এক বিউটিশিয়ানের কাছেই ভাড়া দিল।
ইমতিয়াজ আহমেদ এর বড় ছেলে বিজনেস করে। মেজ ছেলে স্থপতি সে একটা ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিতে কর্মরত আর ছোট ছেলে মেডিকেল কলেজের ইন্টার্নী ছাত্র। সবার ছোট মেয়েটা বেসরকারি মেডিকেলে এমবিবিএস ভর্তি হয়েছে গতবছর।
ইমতিয়াজ আহমেদ চাকুরি থেকে অবসর নেওয়ার পর টের পান তার সম্পদের পরিমাণ তেমন কিছুই নেই শুধু কলাবাগান এর পৈতৃক বাড়িটি ছাড়া। হাতে নগদ অর্থ জমা করতে পারেননি সংসারের খরচ ও চার ছেলে মেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে গিয়ে। কিন্তু এসব নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই। ছেলে মেয়ে কে উচ্চ শিক্ষা দিতে পেরেছেন তিনি ভাবেন এই তার সম্পদ। মনে মনে তিনি বেশ সুখেই আছে। সকাল বিকাল ধানমন্ডির লেকে হাঁটেন নিয়মিত। পুরনো ও নতুন অনেক বন্ধু দের সাথে কথা হয় দেখা হয়। তিনি তাদের কথা শোনেন। তাদের কথায় টের পান অতিরিক্ত সম্পত্তি যে ছেলে মেয়ের কথা চিন্তা করে তারা সারাজীবন কতভাবে টাকা রোজগার করেছেন সেই সম্পদের কারনে তাদের জীবনে এখন অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। অনেকেই বলেছেন যে তাদের ছেলে মেয়েরা চাইছে তারা এখন বৃদ্ধাশ্রম গিয়ে থাকুক।

শুক্রবার ছুটির দিনে সবাই একসাথে নাস্তা করার রেওয়াজ ইমতিয়াজ আহমেদ এর বাসায় অনেক দিন ধরে চলে আসছে। সকাল নয়টার সময় নাস্তা সেরে দেখা যায় ছেলেমেয়েরা আরেক দফা ঘুমিয়ে নেয়। আজ শুক্রবার সকালে একসাথে নাস্তা করার পর যে যার ঘরে না গিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে থাকে।
ইমতিয়াজ সাহেব নাস্তা শেষ করে দৈনিক পত্রিকা হাতে বসার ঘরে এসে বসে। বসার ঘরের দরজার সামনের দেয়ালের মাঝখানে একটা সুদৃশ্য রাজকীয় মানের চেয়ার রাখা আছে। এই চেয়ারটিতে সাধারণত চৌধুরি ইমতিয়াজ আহমেদ বসেন। তিনি ছাড়া এখানে আর কাউকে বসতে দেখা যায়না এমনকি নীলা চৌধুরিও কখনো বসছেন কিনা সন্দেহ।
আজ সেই চেয়ারটিতে বসে দৈনিক পত্রিকা পড়ছিলেন ইমতিয়াজ সাহেব। একটু পরে নীলা চৌধুরির সাথে করে ছেলেমেয়ে সবাই রুমে এসে ঢোকে। শুধু বড় ছেলের বউ রিমি আসেনা। সে নিজের ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে থাকে।
রিমির বিয়ে হয়েছে চার বছর। এক বছর আগে একটি ছেলে সন্তান জন্ম নিয়েছে তার। ঘুমন্ত ছেলের পাশে শুয়ে শুয়ে রিমি ভাবে তার শ্বশুরের কথা। তার এই চালচলন ও আভিজাত্য ধরে রাখার নামে পুরনো সবকিছু আঁকড়ে ধরে রাখা মোটেও পছন্দ নয়। বেশ কয়েকবার তাঁর স্বামী ইমতিয়াজ আহমেদের বড় ছেলে রাতুল কে বলেছে কিন্তু কোন ফায়দা হয়নি। রাতুল রিমির কথা কানেও তুলেনি। তারপর থেকে রিমিও আর কিছু বলেনি। একদিন এই বাড়ি ভেঙে বড় এপার্টমেন্ট তৈরি করা হবে সেদিন রিমি তার মনের মত করে নতুন ডিজাইনের আসবাবপত্র দিয়ে ঘর সাজানোর স্বপ্ন দেখে আসছে।
ছেলের পাশে শুয়ে রিমি ভাবছে আজকের ঘটনার প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে। ইমতিয়াজ আহমেদ কে যখন প্রস্তাব করা হবে বাড়ি ভেঙে ডেভেলপার কোম্পানিকে দিয়ে নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ করার কথা তখন তিনি কি বলবেন। রাজি হবেন নাকি চুপ করে আভিজাত্যেরপ্রতীক ধরে রাখতে চাইবেন। অবশ্য রিমির শ্বাশুড়ি এসব আভিজাত্যের ধার ধারে না। তিনি আধুনিক মনের মানুষ। আধুনিক কায়দা কানুন যতটা সম্ভব তার চলাফেরার মধ্যে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। শ্বশুরের থেকে তাই শ্বাশুড়ির প্রতি পক্ষপাতিত্ব রিমির একটু বেশি। শুধু রিমি নয় রাতুল ছাড়া অন্য ছেলে মেয়েরাও তাদের মায়ের চালচলন ও স্বভাবের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে সবসময়।
গতকাল রাতে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত হয় যে আজ সকালে সবাই মিলে ইমতিয়াজ আহমেদ কে বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি করার কথা বলা হবে। তখন শুধু রাতুল ছাড়া অন্য সবাই সেটাকে সমর্থন করে। এ নিয়ে রাতুলের সাথে গতরাতে রিমির ছোটখাটো একটা ঝগড়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত রিমির দাবির কাছে হার মেনে সে সকালে ইমতিয়াজ আহমেদ এর সাথে কথা বলতে রাজি হয়। তবে শর্ত ছিল সে তার বাবার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যেতে পারবেনা এবং যা কথা বলার সেটা তার মেজভাই মিতুল বলবে। সে শুধু হ্যাঁ বা না বলে চুপ করে থাকবে।
একটু পরে রাতুল শোবার ঘরে ঢোকে। রিমি রাতুলের মুখের দিকে তাকিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে কিন্তু কিছু বুঝতে না পেরে কৌতুহল দমিয়ে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করে
বাবা রাজি হয়েছে নতুন বাড়ি করতে?
রাতুল থমথমে মুখে বলে, জানিনা। এক কাপ চা করে দাও তো।
রিমি বিছানা ছেড়ে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়।

রিমি বুদ্ধি খাটিয়ে সবার জন্য চা তৈরি করে। রাতুল কে চা দিয়ে সে ট্রেতে করে সবার জন্য চা নিয়ে বসার ঘরে ঢোকে। রিমি র উদ্দেশ্য চা দেয়ার নাম করে শ্বশুরের সিদ্ধান্ত জেনে নেয়া।
রিমিকে চা হাতে ঢুকতে দেখে সবাই একটা চনমনে ভাব দেখায়। নীলা চৌধুরি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে নীলাকে বসতে বলে। নীলা তার ননদ পুতুলের পাশে বসে কাপ হাতে। ইমতিয়াজ আহমেদ এর দিকে চায়ের কাপ বাড়িয়ে ধরে ছোট ছেলে শিতুল।
ইমতিয়াজ আহমেদ চায়ের কাপে চুমুক দেয়। ঘরের মধ্যে সবাই চুপচাপ কেউ কোন কথা বলে না।
মেজ ছেলে মিতুল নিরবতা ভেঙে বলে ‘তাহলে বাবা কোম্পানির লোকজনদের আগামী রবিবার বিকেলে আসতে বলি। আমরা সবাই কথা বলে পেপার সাইন করে ফেলি।’
ইমতিয়াজ সাহেব কোন কথা বলেনা। নীলা চৌধুরি বলে, ‘ঠিক আছে আসতে বলো তাদের’।
রবিবার বিকেলে ডেভেলপার কোম্পানির সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী বারটি ফ্ল্যাটের মালিক হবে ইমতিয়াজ আহমেদ এর উত্তরসূরিগণ। ইমতিয়াজ সাহেব দাবি করেন এর মধ্যে থেকে দুইটি ফ্ল্যাট যেন এমনভাবে নির্মাণ করা হয় যাতে তারা আবার একসাথে সবাই থাকতে পারে। কথাটা রিমির ভালো লাগেনি কিন্তু সাহস করে শ্বশুরের সামনে কিছু বলতে পারেনা। কারণ তাকে রাগানোর ইচ্ছে এখন মোটেও নেই ভালোয় ভালোয় বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি করা হোক তখন দেখা যাবে। আর সেটা সে মেজ ছেলে মিতুলকে দিয়েই করিয়ে নিতে পারবে। মিতুল যেতে কোম্পানি তে চাকুরি করে তারাই এ বাড়িটা ভেঙে নতুন বাড়ি করবে। মনে মনে মিতুলকে ধন্যবাদ জানায় রিমি। কারন এই নতুন বাড়ি করার পেছনে যা করার সেই করেছে। তার স্বামী তো ঠিক শ্বশুরের মতোই হয়েছে মন মানসিকতায়। রিমি এই নিয়ে মনে মনে কম গালিগালাজ করেনি স্বামী ও শ্বশুরকে।
বাড়ি ভাঙার কাজ শুরু হয়। ইতিমধ্যে একই ভবনে দুইটি ফ্লাট ভাড়া নিয়ে তাঁরা থাকতে শুরু করেছে। রিমি চাইছিলো এই সুযোগে আলাদা থাকতে কিন্তু রাতুলের অপারগতার কারনে সেটা সম্ভব হয়নি।
বাসা বদলের সময় রিমি ও নীলা চৌধুরি চেয়েছিল পুরনো আসবাবপত্র কিছু বিক্রি করে নতুন ডিজাইনের আসবাবপত্র কিনতে সেটা সম্ভব হয়নি বাবা ও ছেলের কারনে। নীলা চৌধুরি গজগজ করতে করতে বলে
ইমতিয়াজ সাহেবকে
কি এমন তোমার ওই সেগুন কাঠের চেয়ার যে তাকে যুগ যুগ ধরে রাখতে হবে ঘরের মধ্যে।
ইমতিয়াজ আহমেদ জানায় সে যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন ওই সেগুন কাঠের চেয়ারটিও থাকবে। এই চেয়ার তার পূর্ব পুরুষের স্মৃতিচিহ্ন।
নীলা চৌধুরি গজগজ করতে করতে বলছিলো ‘ স্মৃতিচিহ্ন না জঞ্জাল’

নতুন বাড়ি নির্মাণের কাজ শেষ। মাসখানেকের মধ্যেই কোম্পানি তাদের ফ্লাট জমির মালিক ইমতিয়াজ আহমেদ এর পরিবারকে বুঝিয়ে দেবে। নতুন বাড়ি করার সময় ইমতিয়াজ সাহেব কোনদিন দেখতে যায়নি। বাড়ি তৈরির সময় মিতুল রিমি ও নীলা চৌধুরি দেখাশোনা করেন সবচেয়ে বেশি। এমনকি কোন ফ্লোরে তারা থাকবেন কিভাবে গোছগাছ করবেন সব সিদ্ধান্ত তারাই নিয়েছেন।
ইমতিয়াজ আহমেদ বিকেলবেলা হাঁটতে যান। হাঁটা শেষ করে লেকের পাশে একটা বেঞ্চে বসে থাকেন। লেকের পানিতে অস্তগামী সূর্যের আলোর ছায়া নেমে আসে। তিনি সেই ছায়ার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
গত তিন বছর ধরে তার মনের মধ্যে একটা অজানা অদৃশ্য ব্যথা অনুভব করেছেন। যে ব্যথা তিনি পেয়েছেন তার ছেলে মেয়ে ও স্ত্রীর কাছ থেকে। ইমতিয়াজ আহমেদ এর পৈতৃক বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি করার ইচ্ছা ছিলোনা কিন্তু পরিবারের সদস্যদের চাপের মুখে পড়ে তাকে বাড়ি ভাঙার সিদ্ধান্তে মত দিতে হয়েছে।
মেজ ছেলে মিতুল বলছিলো,’ বাবা তুমি মারা যাওয়ার পর তো আমরা বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি করবোই সুতরাং তুমি বেঁচে থাকতে কেন এই সিদ্ধান্তে রাজি হচ্ছোনা ? আমাদের পক্ষে তো এই ভাঙাচোরা স্যাঁতসেঁতে বাড়িতে থাকা সম্ভব নয়।’ তার স্ত্রী নীলাও তার এই কথাকে সমর্থন করেছে। নীলা স্বামীর আবেগী মনের খোঁজ এতটুকুও রাখেনি কোনদিন।
সে যে চেয়ারটিতে বসেন সেটা ছিল তার মরহুম দাদা চৌধুরি আফসার উদ্দিনের। তিনি ছিলেন ছোটখাটো একজন জমিদার। তার জমিদার মহলে একবার বেড়াতে আসেন তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি। যার সম্মানে ও বসার জন্য আফসার উদ্দিন এই চেয়ারটি তৈরি করেছিলেন। সুন্দর নকশা কেটে চেয়ারটি তৈরি করতে বিশজন সুতারের তিন মাস সময় লেগেছিল বলে তিনি শুনেছেন ছোটবেলায় তার দাদীর কাছ থেকে। চেয়ারটি দেখে এতোটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে ব্রিটিশ সাহেব তাকে তখন চৌধুরি উপাধি তে ভূষিত করেন। সেই থেকে আফসার উদ্দিন নামের আগে চৌধুরি উপাধি ব্যবহার করতেন এবং বংশ পরম্পরায় তারা হয়ে ওঠেন চৌধুরি পরিবার।
আফসার উদ্দিন ব্রিটিশ সাহেবকে চেয়ারটি উপহার দিয়েছিলেন কিন্তু সেই সময় রাজনৈতিক প্রতিকূলতার জন্য তিনি চেয়ারটি পূর্ববঙ্গ থেকে রাজধানীতে নিয়ে যেতে সাহস করেননি। তিনি সেটা গ্রহণ করে আফসার উদ্দিনকে আবার ফেরত দেন। সেই থেকে এই সেগুন কাঠের চেয়ারটি হয়ে যায় তাদের বংশীয় আভিজাত্যের প্রতীক। তিনি অনেকবার এই কথা নীলা চৌধুরি ও সন্তানদের কাছে বলেছিলেন কিন্তু বড় ছেলে রাতুল ছাড়া অন্য সবাই সেটা নিয়ে কোন আগ্রহ দেখায়নি।
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নামে। ইমতিয়াজ আহমেদ লেক থেকে তার ভাড়াবাড়িতে ফিরে আসেন। ঘরের ভেতর সবকিছু এলোমেলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তাঁরা আগামী মাসে তাদের নতুন বাড়িতে উঠবে তাই সবকিছু গোছগাছ বাঁধা চলছে। ইমতিয়াজ আহমেদ এসে সেগুন কাঠের চেয়ারটিতে বসেন। তার শরীরটা কেমন ক্লান্ত হয়ে গেছে ইদানিং। বুকের ভেতর চিনচিনে একটা ব্যথা অনুভব করেন কিন্তু পরিবারের কাউকে সেটা জানাননি তিনি। ইমতিয়াজ আহমেদ টের পায় তিনি বয়সের ভারে ন্যুব্জ হতে চলেছেন। ইমতিয়াজ সাহেবের নাতী বসার ঘরে ঢোকে হাতে একটা খেলনাগাড়ি যেটা রিমোট কন্ট্রোলে চলে।

আজ সবাই খুব খুশি চৌধুরি পরিবারের। তারা আজ নতুন বাড়িতে উঠবে। গত দুইদিন যাবত সমস্ত জিনিসপত্র নেয়া হয়েছে তারপরেও কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস আজ সকালে তাদের সাথেই নিতে হবে। নীলা চৌধুরি ও রিমি খুব খুশি মনে সকাল বেলা সবাইকে ডেকে তুলে নাস্তা খাইয়ে জরুরি তাগাদা দেয়া শুরু করছে। রিমি খুব খুশি মনে মনে। সে নতুন বাড়িতে আলাদা একটা ফ্ল্যাট নিয়ে ইনটেরিয়র দিয়ে ডিজাইন করে মনের মত করে সাজিয়েছে। নতুন ফ্লাটে সব ঝকঝকে চকচকে নতুন পলিশ করা আসবাবপত্র। এতোদিন কোন আত্মীয় স্বজন বন্ধুদের তার বাসায় ডেকে এনে আনন্দ করতে পারেনি কোন পার্টি দিতে পারেনি এবার সে ছেলের জন্মদিন উপলক্ষে একটা জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে সেই সাথে তার নতুন ফ্ল্যাটের সাজসজ্জাও দেখানো হবে তার আত্মীয় স্বজন বন্ধুদের।
নীলা চৌধুরি এতোদিন পর যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তিনি মনের মত করে তার ফ্লাট সাজিয়েছেন নতুন ডিজাইনের আসবাবপত্র দিয়ে। তিনি মনে মনে পূত্রবধুর সাথে প্রতিযোগিতা করে নতুন নতুন ডিজাইনের আসবাবপত্র দিয়ে ঘর সাজিয়েছেন যাতে দেখে সবাই বলে না তার রুচি ও পছন্দ মোটেও সেকেলে নয় বরং অত্যাধুনিক।
ইমতিয়াজ সাহেবকে নীলা নতুন বাড়ির গোছগাছ নিয়ে কোন কথা বলেনি। নতুন বাড়ি সাজাতে যে টাকাপয়সার দরকার হয়েছে সেটা সে নিজের উপার্জনের টাকা ও মেজ ছেলের সহযোগিতায় করেছে। পুরনো আসবাবপত্রের দোকানে গিয়ে ঘরের পুরনো যা কিছু ছিলো সব বিক্রি করে দিয়েছেন।
তার ইচ্ছে নতুন বাড়িতে সব নতুন ডিজাইনের আসবাবপত্র থাকবে। সেকেলে কোন কিছু আর স্থান পাবে না।
সবাই ভাড়াবাড়ি থেকে বের হয়ে বাইরে এসে গাড়িতে ওঠে। নতুন বাড়ি বেশি দূরে নয়। ইমতিয়াজ আহমেদ এসে ওঠেন সবার শেষে।
সকাল থেকেই তার শরীরটা খারাপ লাগছিল। ইচ্ছে করছিল আরেকটু ঘুমিয়ে নেবেন কিছু স্ত্রীর ডাকাডাকিতে আর সম্ভব হয়নি সেটা। শরীর খারাপের কারনে সে বাসা বদলের কোন কাজে সাহায্য করতে পারেনি। গতকাল দেখেছেন তার ঘরের পুরনো আসবাবপত্র একটা ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে যেতে। নীলা সব বুঝিয়ে দিচ্ছিল এমনকি তার সেগুন কাঠের চেয়ারটিও দেখছেন দুটো লোক ধরাধরি করে ঠেলাগাড়িতে ওঠাতে। লোকদুটো বলাবলি করছিল চেয়ারটি আগের দিনের এখন আর এমন জিনিস চোখে পড়েনা। ইমতিয়াজ আহমেদ তখন মনে মনে তার পারিবারিক ঐশ্বর্যের ও আভিজাত্যের কথা ভেবে একটু পুলকিত হয়েছেন।
গাড়ি এসে নতুন বাড়ির নীচে থামে। সবাই তাড়াতাড়ি করে নেমে লিফটের দিকে এগিয়ে যায়। ইমতিয়াজ আহমেদ লিফটের সামনে এসে দাঁড়ায়।
লিফট ততক্ষণে উপরে উঠে গেছে সে অপেক্ষা করে।
ইমতিয়াজ আহমেদ কতক্ষণ দাড়িয়ে ছিল তার মনে নেই সে যেন চোখে অন্ধকার দেখে তার মাথাটা হঠাৎ চক্কর দিয়ে উঠে বুকের ভেতর কে যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।ততক্ষণে লিফট নিচে নেমে আসে। বুক চেপে ধরে সে লিফটে ওঠে।
নীলা তার হাত ধরে নতুন ফ্ল্যাটে ঢোকে। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব রুমে নিয়ে যায়। ইমতিয়াজ আহমেদ এর বুকের ব্যথা বাড়তে থাকে। নীলা কি বলছে সেসব তিনি শুনছেন না। সে তার পুরনো সেগুন কাঠের চেয়ারটি খুঁজছেন। চেয়ারটিতে বসে সে পূর্ব পুরুষদের অস্তিত্ব অনুভব করেন।
ইমতিয়াজ আহমেদ নীলা চৌধুরি র কাছে জানতে চান তার চেয়ার কোথায় রেখেছে।
নীলা জানায় পুরনো কোন আসবাবপত্র তিনি এ বাড়িতে নিয়ে আনেননি সেসব পুরনো আসবাবপত্রের দোকানে বিক্রি করে দিয়েছেন।
ইমতিয়াজ আহমেদ এর সামনে ভেসে ওঠে তার চেয়ারটির ছবি। শুধু চেয়ার নয় সেখানে সে তার পিতা চৌধুরি আফজাল আহমেদকে যেন বসে আছেন সেই দৃশ্য দেখতে পাচ্ছেন। আফজাল আহমেদ তার একমাত্র ছেলে ইমতিয়াজ আহমেদকে বলছেন শোন বাবা পারিবারিক আভিজাত্যের প্রতীক এই চেয়ার। এই চেয়ারটিতে বসেছি আমি এতোদিন আজ থেকে তুমি এই চেয়ারে বসবে। তোমার যে সন্তান সবচেয়ে উপযুক্ত হবে তাকে সম্প্রদান করবে এই চেয়ার এবং তাকে এর মর্যাদা দিতে বলবে বংশ পরম্পরায় এটা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে দেবে। যেদিন এই চেয়ার তুমি হারিয়ে ফেলবে বা এটা নষ্ট হতে থাকবে মনে রেখো সেদিন থেকে তুমিও এই পরিবারের সম্মান ও মর্যাদা কমতে থাকবে।
ইমতিয়াজ আহমেদের বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথাটা বাড়তে থাকে। সে বুক চেপে ধরে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে। তার সামনে শুধু চেয়ারটির ছবি ভাসতে থাকে। যে করেই হোক তাকে সেই পুরনো আসবাবপত্রের দোকানে গিয়ে চেয়ারটি ফেরত আনতে হবে। পাড়ায় বেশ কয়েকটি এ ধরনের দোকান আছে নীলা কোন দোকানে বিক্রি করে দিয়েছে চেয়ারটি সেটা তাকে খুঁজে বের করতে হবে সে আর সময় নষ্ট করেনা। বুকের ব্যথাটা ক্রমশ বাড়তে থাকে ইমতিয়াজ আহমেদ সেদিকে খেয়াল করেনা। তার মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে। চোখে অন্ধকার দেখছেন। সামনের রাস্তাঘাটের যানবাহনের সংখ্যা তার সামনে অস্পষ্ট হতে থাকে তার কানে বাজে শুধু বিভিন্ন চিৎকার শব্দ গাড়ির হর্ণ। ইমতিয়াজ সাহেব এদিকে ওদিকে খুঁজতে থাকেন পুরনো আসবাবপত্রের দোকান। তার চোখের সামনে সব অন্ধকার সে কিছুই দেখতে পায়না।অবশেষে এক দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়। সেখানে পরপর বেশ কয়েকটি দোকান। ইমতিয়াজ আহমেদ দোকান গুলোর সামনে উদভ্রান্তের মতো খুঁজতে থাকেন তার বংশ পরম্পরায় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সেই সেগুন কাঠের চেয়ার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *