Uncategorized

বৃষ্টি দিনের চিঠি || মাহাবুবা লাভীন

নিরুপম,
ক’দিন থেকে মনটা ভালো যাচ্ছে না।এদিকে তোমারও কোন খবর নেই।গতপরশু রাত্রির সঙ্গে আমার হঠাৎ দেখা হয়েছিল, দেখছি ও ওর নতুন সংসারের কেনাকাটায় ব্যস্ত।তার ফাঁকেই গল্প হলো,সিঙারা হাউসে সিঙারা খেতে খেতে।ওর কাছ থেকেই জানলাম, তুমি আমার খোঁজ করছ ক’দিন থেকে।আমাকে পাওনি বলে নাকি অস্থির সময় কাটছে তোমার।রাত্রির মুখে এসব শুনতে ভালো লাগে না আমার,কারণ আমি তখন ওর চোখে তোমার জন্য জ্বলে ওঠা ভালোবাসাটা পুড়ে যেতে দেখি,কী শূণ্যতা দেখি ওর চোখে, তোমার জন্য!ওর চোখের পাতার তিরতির কাঁপুনি আমি আমি এড়াতে পারি না,অমন সুন্দর একখানা চাঁদমুখ যখন বিষণ্নতায় কালো হতে দেখি তখন কেমন কষ্ট হয় আমার!তুমি কিন্তু চাইলেই এই মেয়েটার সঙ্গে কাঁটিয়ে দিতে পারতে জীবনের বাকীটা সময়,বহুবার বলেছি একথা,শুনলে না।অবশ্য কোনদিনই আমার কোনকথা শোনার ইতিহাস তোমার নেই।তুমিও বাপু!বলি ওর কাছে আমার খোঁজখবর করার দরকার কী!আমি যে মরে যাইনি এ তো তুমি কোনরকম খবর ছাড়াই বিশ্বাস করতে পারো।তুমিই তো বলো,আমাকে মারার আগে যমদূত নাকি আগে তোমার কাছে এসে পারমিশান নেবে।তো,এসেছিলো কি?নিশ্চয় না,হা হা হা!এবার বলি,আমাকে পাওনি ছোট ফোনটায়, কারণ ফোনটা সেদিন বৃষ্টির পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে,আর কেনা হয়নি।কিন্তু অন্য নম্বরটি তো তোমার কাছে আছে,সেখানে নক করনি যে।নম্বর হারিয়ে ফেলেছ নাকি?আর আমি এদিকে কতকিছু ভাবছি,প্রতিদিন আমিও তোমার নম্বরে একবার হলেও নক করে যাচ্ছি,কিন্তু পাচ্ছি না তো,ব্যাপার কী বলতো?তোমার টিএনটিতে ফোন দেবার সাহস আমার কুলোয় না,কে না কে ধরে।তাছাড়া মনটা ক’দিন থেকে ভালো যাচ্ছে না,অফিস থেকে ছুটি নিয়েছি,কিন্তু এ আরও মনখারাপের জ্বালা বাড়াচ্ছে।কিচ্ছু ভালো লাগছে না।জানোই তো বৃষ্টি হলে বরাবরই আমার মন খারাপ হয়,সেই যে ছোটবেলায় একবার সারারাতের ঝুম বৃষ্টিতে ঘরের চাল ফুটো করে আমার নতুন বইগুলো ভিজিয়ে দিয়েছিল,এরপর হেডস্যার আর আমাকে নতুন বই দেননি সেবছর।সারাবছর আমার বান্ধবীরা যখন নতুন বই নিয়ে লাফিয়ে পড়াশুনা করলো,আর আমার পুরনো, ছেড়া বইয়ে কেটে গেল সে বছরটা।একথা এখনও মনে পড়লে আমার চোখে বৃষ্টি নামে,সেদিনের বই ভেজার মতো করে আমার আজ বুক ভেজে।সে বছরটা কোনরকম কাটিয়ে দিয়ে পরের বছর যখন নতুন ক্লাসে উঠলাম,নতুন বই পেলাম,আমার সে কী কান্না!তখন থেকে আমি যতদিন পড়াশুনা করেছি,এক অজানা আতঙ্কে প্রতিরাতে ঘুমানোর আগে বইগুলো ভালো করে পলিথিনে মুড়িয়ে মায়ের কাঠের বাক্সটার মধ্যে ঢুকে রাখতাম।এরপর বড় হলাম,তোমার সঙ্গে পরিচয়,কী একটানাপোড়নের মধ্যে আমাদের সম্পর্কটা চলতে থাকলো,রাত্রি তোমার জন্য পাগলপ্রায় তখন,আর তুমি আমার জন্য।অন্যদিকে, আমার বাসা থেকে কোনভাবেই এ সম্পর্কটি মেনে নেয়া সম্ভব হবে না কোনদিন,এই বাস্তবতার মধ্যেও আমরা কত বৃষ্টিতে ভিজেছি,কতদিন কলেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির জল ছিটিয়ে দিয়েছি পরস্পরের মুখে,কতদিন তুমি ইচ্ছে করেই আমার ছাতাটা নিয়ে দৌঁড়ে পালাতে আর আমাকে বলতে, “ভিজে যাচ্ছো,ভিজে যাচ্ছো,তাড়াতাড়ি আসো,আরে,দৌঁড়ে আসো”। আর আমি দৌঁড়াতে লজ্জা পেতাম,তাই একটু দ্রুত হেঁটেই কলেজের বারান্দায় উঠতাম।পরে বলতে, আমাকে নাকি হালকা বৃষ্টিতে তোমার দেখতে খুব ভালো লাগে।মনে আছে তোমার, এটা নিয়ে একবার তুমুল ঝগড়া বাধলো দু’জনের মধ্যে। আমি তোমাকে অসভ্য, ইতর নোংরা যা নয় তাই বলে গালিগালাজ করলাম।তুমিও কেমন ছোটদের মতো কলেজে অতজনের সামনে কেঁদে দিলে রুপকের গলা জড়িয়ে।তারপর সে রাত্রিতে আর আমি ঘুমোতে পারিনি,অপেক্ষা করছিলাম আর একদিনের তুমুল বৃষ্টির জন্য।মনে মনে ভেবে রাখলাম,এদিন বৃষ্টি হলে আমি ইচ্ছে করে তোমার সামনে ভিজে যাবো,তাতে যদি তোমাকে আমার ভুল বোঝার অপরাধ কিছুটা কমে।যা হোক,তুমি সেবার সপ্তাহখানেক আর কলেজে এলে না,আমিও মন খারাপের সঙ্গেই কাটালাম,অবশ্য সে সময়টা তোমার বন্ধু রুপক আমাকে অনেকটা সময় দিয়েছিল।সপ্তাহখানেক পর তুমি এলে হাতে গিফটপেপার মোড়ানো একটি ব্যাগ নিয়ে। আমার সামনে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে থাকলে,মাথাটা নিচু করে ব্যাগটা আমার দিলে এগিয়ে দিলে।আবেগ আর উত্তেজনায় আমি হাউমাউ করে কেঁদে দিলাম।মাথা নেড়ে কাঁদতে বারণ করছিলে বারবার।এরপর কান্না থামিয়ে যেই ব্যাগটা খুলতে যাবো,এমন সময় ইশারায় বললে এটা যেন বাসায় গিয়ে খুলে দেখি,কেমন অস্থিরতা কাজ করতে লাগলো মনের ভেতর।আর সঙ্গে ভয়ও।এই উপহার আমি কী করে বাসায় নিয়ে যাবো,কী না কী আছে,কেউ যদি দেখে ফেলে,মা যদি দেখে ফেলে তাহলে তো মহা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।আর বাবা দেখলে তো একটি মারও মাটিতে পড়বে না,সব পিঠেই পড়বে নিশ্চিত।উপহারটা যদি বই হতো তাও একটা গোঁজামিল দেওয়া যেত।কিন্তু ব্যাগটা হাতে নিয়ে থ্যালথ্যালে ভাব দেখে নিশ্চিত এটি আর যাই হোক,বই নয়।এদিকে রুপক,সুপর্ণা সবাই উপহার দেখার জন্য ব্যস্ত।কিন্তু খুলতে পারলাম না,বাসায় নিয়ে গেলাম চুপিসারে।বাসায় গিয়ে দেখি ভালোই হলো,মা বাসায় নেই।এ সুযোগে খুলে ফেললাম প্যাকেটটা।অবাক হয়ে গেলাম! দেখছি ভীতরে একটি রেইনকোর্ট।আর তারমধ্যে ছোট্ট একটি চিরকুট,তাতে লিখা”বৃষ্টিতে এই রেইনকোর্টটি পরতে ভুলো না।তবে অনুরোধ, কখনও ভুল করেও মুখ ঢেকো না,তোমার মুখে বৃষ্টির ফোঁটা আমি যেন দেখতে পাই”।চিরকুটটা বুকে জড়িয়ে কেমন অপরাধবোধে গুটিয়ে যাচ্ছিলাম।আরও একদিনের কথা,যেদিনের কথা আমি ভুলতে পারবো না চোখদুটো শেষবার বন্ধ হবার মুহুর্তেও।তুমি আর আমি অলক দাদার রসায়ন প্রাইভেট শেষ করে ফিরছি কলেজের দিকে।মাঝপথে দুম করে বৃষ্টি নেমে এলো,পথিমধ্যে একটা দোকানও নেই,যার ঝাপির নিচে একটু আশ্রয় নেয়া যায়,শুধু একশো বছর পুরনো প্রকাণ্ড একটা বটগাছ।তুমি বটগাছের নিচে তোমার সাইকেলটা আমাকে ধরতে বলে কিচ্ছু না বলে ভোঁ দৌঁড় দিলে ভারী জঙ্গলের দিকে।আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না,কী হচ্ছে। একটুপর তুমি হাঁপাতে হাঁপাতে একটা ঢাউস মানকচু পাতা নিয়ে ফিরলে।এরপর সেই কচুপাতাকেই ছাতা করে আমরা পৌঁছেছিলাম কলেজে।মনে আছে তোমার এসব?মনে আছে তো?বৃষ্টি যার জীবনে এতো সুখস্মৃতি জাগায় তার জীবনে বৃষ্টির দুঃসহ স্মৃতিও তো কম নয় বরং ঢেরবেশি।একবার ভারী বর্ষণে বন্যা নেমে এলো,
রাত তখন বেশ গভীর,দু’চারটে শেয়ালের ডাক ছাড়া কিছুই কানে আসে না তেমন।হঠাৎ চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল।জেগে দেখি কেমন বিপন্ন মুখে ছোটপিসি বিলাপ করে যাচ্ছে।বাকি সবার মতো আমারও বুঝতে বাকি রইল না,ভিটেমাটি সব গ্রাস করেছে নদী তার।কিন্তু যেটা বুঝতে আমার সময় লেগেছিল,সেটা হলো,সে বন্যায় ভেসে গেছে পিসির কপালের সিঁদূর,পাড় ভাঙার শব্দের সঙ্গে মিলিয়ে গেছে শাখা পলা ভাঙার শব্দ।পিসেমশাই বছর দশেক থেকে বিছানায় নিশ্চল হয়ে পড়েছিলেন,কিন্তু পিসিকে দেখতাম কোনো বিরক্ত না হয়েই পিসি এমন নিশ্চল নিথর মানুষটার জন্যই রোজ সিঁথি ভর্তি সিঁদুর পরতেন।অথচ এই মানুষটাকে হঠাৎ বন্যায় আর টেনে তুলতে পারেননি পিসি!ভেসে গেলেন স্রোতের সঙ্গে! এছাড়া এই যে আমাকে গতবছরও যে মেয়েটা আমাকে সারাক্ষণ সঙ্গ দিতো,মাতাল করে রাখতো এ ঘরটা হটাৎ করে সেদিন বৃষ্টিতে ছাদে উঠতেই বজ্রপাতে কেমন হারিয়ে গেল!এসব ভাবলে আর বৃষ্টি ভালো লাগে না এখন।বৃষ্টি ছোঁবার আশায় জানালায় হাত বাড়াতেই কেমন গুটিয়ে আসে হাত।ভাবতে গিয়ে এখনও কেমন জড়িয়ে যাচ্ছে আমার হাত,আমি আর পারছি না নিরুপম।ভালো থেকো…

তোমার
রুদ্রাণী

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *