গল্প

মরিয়ম লিপি’র গল্প || ভুলের মৃত্যু

নীলয়ের মা জানালার গ্রিল ধরে মেঘলা আকাশের খেলা দেখছে। ওই আকাশটাকে, মেঘ তার সব অন্ধকার দিয়ে মাখিয়ে দিচ্ছে। আবার সেই মেঘ সাদা আভায় আলোকিত করে উজ্জ্বল করে দিচ্ছে। এই মেঘের খেলায় নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেল সে। নীলয়ের মা’র বিয়ের ২৪ বছর হয়ে গেলো। খুব যত্ন করে তার স্বামীর বাড়ির মানুষগুলোকে আপন করার চেষ্টা করেছিলো, কারণ তাদের বিয়েটা ছিলো প্রেমের বিয়ে। শ্বশুর, ভাসুর, দেবর ননদ কেউ তাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়নি। বাড়ির কাজের লোকদের সামনে বহুবার অপমান হতে হয়েছে৷ ভাসুরটার আচরণ খুব অপমানজনক ছিলো। কথায় কথায় হেয় করতো তাকে। কোনদিন নীলয়ের বাবাকে সে কিছুই বলতো না, পাছে ভাইবোনদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়! নিজগুণে শ্বশুরবাড়ির প্রত্যেকটি মানুষের মন জয় করেছিলো সে। শ্বশুরের মৃত্যুর পর পরিবারটির একতা ভেঙ্গে যায়। নীলয়ের মা খুব করে চেয়েছিলো, সংসারটি এক সুতায় রাখতে। স্বার্থ মানুষকে খুব লোভী করে তোলে। নীলয়ের দাদার পাঁচতলা বাড়ি ছিলো, একেকজন একেকফ্ল্যাট দখল করার লোভে সবাই মরিয়া হয়ে উঠলো। রক্তের সম্পর্কের কোনো মূল্যই রইলো না। সেই পরিবারে শুরু হলো নীলয়ের মায়ের নতুন জীবন। টুনাটুনির মতো বড়ো ফ্ল্যাটটাকে দুইভাগে ভাগ করে নিলো। এক ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে অন্যফ্ল্যাটে নিজেরা থাকার জন্য উঠলো। নীলয়ের বাবার তখন চাকরি নেই। প্রতিমাসের ১ তারিখ থেকে ৫ তারিখের একটা অপেক্ষায় থাকতো দুজন। বাসাভাড়া পেলেই প্রথমদিন বিরিয়ানির প্যাকেট, বা শিক-কাবাব, নান, কোল্ডড্রিংস; এসব খাওয়ার জন্যে। এভাবেই কেটে গেলো একবছর। মাঝে নীলয়ের বাবা একটা টিউশনি পেলো। নীলয়ও পেটে এলো। টিউশনির টাকা জমানো শুরু হলো। নীলয়ের জন্মের সময় হসপিটালের সকল খরচ হবে এই টিউশনির জমানো টাকা থেকে। সময় এগিয়ে এলো ডেলিভারির৷ হাসাতালে ভর্তি হওয়ার ডেট ঠিক হলো। নীলয়ের মা এই নয়মাসে,বহু পছন্দের খাবার খেতে ইচ্ছে হলেও কোনোদিন প্রকাশ করেনি অসচ্ছলতার কারণে। হাসপাতালে যাওয়ার আগেরদিন নীলয়ের বাবা গল্পে গল্পে জানতে পারলো, নীলয়ের মায়ের ২২ রকমের খাবার খাওয়ার মেন্যু। ভদ্রলোক পুরান ঢাকা থেকে শুরু করে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে অবশেষে ১৯ রকমের খাবার কিনে আনলো। হাসপাতালে যাওয়ার আগে নীলয়ের মা বাড়ির ঝুল, ফ্রিজ, ফ্যান এইসব একাই পরিষ্কার করে রাখে। কারণ শিশি নিয়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার ভেতর সে বাসায় প্রবেশ করবে। আর যদি সে আর ফিরে না আসে; যেনো গোছানো সংসারে তার স্বামী আর সন্তান প্রবেশ করতে পারে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে জল পড়লো।

আজ নীলয়ের মা ছোটোছেলেটিকে নিয়ে সংসারে একা। নীলয় কাছে নেই, বিয়ে করে বউ নিয়ে আলাদা হয়ে গেছে। নীলয়ের বাবাও আলাদা থাকেন। একটি পরিবার তিনটি ভাগে ভাগ হয়ে গেলো। কিন্তু কেন? দোষ কার? নীলয়ের মায়ের একার? নীলয়ের বাবার একার? না নীলয় অল্পবয়সে বিয়ে করাতে? নীলয়ের মায়ের সংসার ছিলো টিপটপ। একহাতে সংসারের বাজার, রান্না, বিলপত্র, বাচ্চাদের স্কুল সব নিজেই সামাল দিয়েছেন৷ নীলয়ের বাবা চাকরি পেলেন নীলয়ের জন্মের একমাস পর। সারাদিন পর অফিস শেষ করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে রিলাক্স হয়ে বাসায় ফিরতেন। নীলয়ের মা’র এই ব্যাপারে কোনো অবজেকশন ছিলো না৷ সে মনে করতো, অফিস শেষ করে বাসায় ফিরে মুড অফ করে ঘরে ফেরার চেয়ে রিক্রিয়েশন করে ঘরে ঢোকাটাই ভালো। সব যুক্তিই যে জীবনে সুখ ফিরিয়ে দেবে; এই ভাবনাটা ভুল; সেটা বুঝতে পেরেছিলো বহুবছর পর। বন্ধুদের সাথে শুধু আড্ডা নয়; নেশা করাও শুরু করলো নীলয়ের বাপ। আড্ডা বাড়তে বাড়তে শুরু হলো বাইরে রাত্রিযাপন। শুরু হলো জুয়া খেলা। রাত্রের পর রাত বাসায় ফিরতো না সে। বৃহস্পতিবার অফিস করে চলে যেতো জুয়ার আড্ডায়। শুক্রবার হাফবেলা অফিস করে আবার একই খেলা আর নেশায় পড়ে থাকতো। বাসায় ফিরতো রবিবার ভোরে। বাসায় ফিরে গোসল করে খেয়েই ঘুম। ঘুমের মাঝে নিলয়ের মা তাকে খাইয়ে দিতো। নিলয়ের মা খুব ভালোবসতো নিলয়ের বাবাকে। তার অন্যায়গুলো একসময় যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়ালো তাদের দাম্পত্য জীবনে।তখন ফ্রাস্ট্রেশন হয়ে নিলয়ের মা আত্মহত্যা করতে চেয়েছে বহুবার। ওপাশ থেকে নিলয়ের কান্না তাকে থামিয়ে দিতো। আজ মনে হয় নিলয়ের মায়ের এখন যে জীবনের মৃত্যু হয়েছে, বেঁচে থেকে প্রতিটি মুহূর্তকে একেকটি আত্মহত্যার চেয়ে কঠিন মনে হয়। তখন মরণ হলে আজ এতো বেশি কষ্ট পেতে হতো না। এতটা যুদ্ধ করতে হতো না। ছোটোছেলের কত চাহিদা; পূরণ করার ক্ষমতা আজ তার নেই! শিশুটি যখন চিৎকার করে কাঁদে; বুকের ভেতর কষ্ট হয় তার। ছোটোছেলেটির নাম নিশাত, সেই ছেলেটির কী দোষ? ছোটো থেকে বড়ো হয়েছে একরকম। যা চাইতো তাই পাইতো, আজ বহুবার চাওয়ার পর সবকিছু পায় না। কারণ, আজ তার মা গরীব। তার বাবার সংসারে জমানো ১২ লক্ষ টাকা দিয়ে নিলয়ের দাদার বাড়ির ফ্ল্যাটটা আধুনিক করেছিলো। বাপদাদার, নানির সম্পত্তির সব টাকা দিয়ে ঘরের ফ্রিজ, এসি, ওয়াসিং মেশিন, ওভেন সব কিনেছিলো সে। কখনো নিজের জন্য কোনো গহনা বা দামি শাড়ি কেনার চিন্তা করেনি। অথচ আজ নিলয়ের বাবা শেপারেশনের পর কোনো ফার্নিচার, নিলয়ের মায়ের জামাকাপড় কিছুই দিচ্ছে না। নিলয়ের মা জাজিম বানিয়ে, কিছু হাঁড়িপাতিল, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র পুরানো কিনে নতুন সংসার গুছিয়ে নিলো৷ নিশাতের সাথে বাকি জীবন একা কাটাবে বলে। সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। হিসেব মিলাতে পারছেন না জীবনের৷ সংসারের সবকিছু একএক করে সাজিয়ে চব্বিশটা বছর শেষ করে এই উপহার পেলো সে? নিশাত কি পারবে তার এই দুঃখী মায়ের কষ্ট ভুলিয়ে দিতে? পারবে কি সে বাকিটা জীবন একা লড়াই করতে বর্তমান সমাজে? এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একদিন নিলয়ের মা স্ট্রোক করে মারা গেলো। নিশাতের জীবন কীভাবে চলবে জানা নেই। বাবার ভুলের জন্যে আজ নিশাত একা। নেশা মানুষকে অন্ধ করে ফেলে, বিবেকহীন করে ফেলে। তবুও মানুষের বিবেক বোধ ফিরে আসে না। যে স্বামী স্ত্রী কে সুখ দিতে পারবে না; নেশা করবে, জুয়া খেলবে, নিজেকেই শুধু ভালবাসবে; তাহলে কেনো একটি মেয়েকে বিয়ে করে তার জীবন নষ্ট করবে? এই ধরনের পুরুষদের জন্যে আইন থাকা উচিৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *