কলাম

মীর আব্দুল আলীম || লকডাউন যেন বোঝার উপর শাকের আঁটি অতিমারী রোজা; গরীবের বোঝা

লকডাউন যেন বোঝার উপর শাকের আঁটি অতিমারী রোজা; গরীবের বোঝা

অতিমারী আর রোজায় হয়ে উঠেছে গরিবের বোঝা। বোঝার উপর শাকের আঁটি যেন
লকডাউন। রোজা, মহামারী আর লকডাউনকে পুজি করে রাতারাতি আঙ্গুর ফুঁলে
কলাগাছ হচ্ছেন এদেশের ব্যবসায়ী মজুতদার। মওকা বুঝে তারা পণ্যের দাম
বাড়িয়ে হাতিয়ে নেয় কোটি কোটি টাকার বাড়তি মুনাফা। রোজার মাস এলে এক
শ্রেণির ব্যবসায়ী কখন কিভাবে পণ্যের দাম বাড়ানো যায় সে ভাবনায় যেন ওঁৎ
পেতে থাকেন। সরকার সচেষ্ট থাকে পণ্যের দাম যেন সাধারণ মানুষের নাগালের
মধ্যে থাকে। এ জন্য আগেভাগেই পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা হয় সরকারের পক্ষ
থেকে। কিন্তু কাজের কাজ তেমন একটা হয় না। পণ্যেও দাম বড়েই। এবারও বেড়েছে।
এ দেশে পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করার জন্য অসাধু
ব্যবসায়ীরা প্রস্তুত থাকে। বাজারে পণ্যের সংকট তৈরি করে কোনো দৃশ্যমান
কারণ ছাড়াই দাম বাড়ানো হয়। ব্যবসায়ীরা মওকা বুঝে এ সময়টাতেই চাহিদা
সম্পন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। বড় ব্যবসায়ী থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সবার
প্রবণতা এই সময় বেশি লাভ তুলে নেয়ার।
সারা দুনিয়ায় ধর্মীয় উপলক্ষ বা উৎসবের সময় জিনিসপত্রের দাম বরং কমে।
রমজানকে ঘিরে শুধু আরবে নয়, ইউরোপ-আমেরিকায় ছাড়ের হিড়িক পড়ে যায়।
মাসখানেক আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় ছাড়ের উৎসব। রমজান মাসে মধ্যপ্রাচ্যসহ
বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশে মূল্য ছাড়ের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। মোট
জনসংখ্যার ৮৮.৮ ভাগ মুসলমানের এই দেশে পবিত্র মাসে এ অমানবিক কাজটি কেন
হচ্ছে তা আমাদেও বোধগম্য নয়। মুসলমান হয়ে পুণ্যের মাসে অপুণ্যের কাজ তারা
করে কি করে?  অনেকে ব্যবসায়ী বছরভর এ সময়টার জন্যই অপেক্ষা করে। সারা
বছরের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে রাখে তারা। আর সময় এলেই সুযোগা বুঝে দাম
বাড়ায়। মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের
দেশগুলোয় পবিত্র রমজানে পণ্যে মূল্য ছাড় দেয়া হয়। এমনকি বাজারদর
স্বাভাবিক রাখতে সরকারিভাবে নজরদারি চলে এসব দেশে। মুসলিম দেশগুলোতে দেখা
যায় ব্যবসায়ীরা তাদের পূর্বের মুনাফা থেকে ছাড় দিয়ে ব্যবসা করেন। পণ্যের
দাম না বাড়িয়ে সেখানে কমিয়ে দেন। বিশেষ ছাড় আবার অনেক ব্যবসায়ী লাভবিহীন
পণ্য বিক্রি করে মাসজুড়ে।
হিন্দু-অধ্যুষিত প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও রোজার মাসে পণ্যের দাম বাড়ে
না। সেখানেও কিন্তু আমাদের দেশ থেকে বেশি মুসলমানের বসবাস। প্রায় ১৭ কোটি
২২ লাখ। আর আমাদের দেশের চিত্র উল্টো। রোজার মাসে প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম
যে পরিমাণ বাড়ানো দরকার ততটাই তাদের ইচ্ছামতো বাড়িয়ে ছাড়ে মজুতদাররা।
করোনার কারণে লকডাউনের অজুহাতে পণ্যমূল্য বাড়তি হিসাবে যোগ হয়েছে। তাতে
অতি দামে পণ্য কিনতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। দ্রমব্যর দাম বাড়ছে
তো বাড়ছেই। উদাহরণ হিসেবে নিজ অভিজ্ঞতার কথা না বললেই নয়। আমি আর আমার
স্ত্রী রোজা শুরুর দু’দিন আগে রাজধানীর স্বপ্ন সুপার শপে খাদ্যপণ্য কিনতে
গিয়েছিলাম। সব পণ্যের মধ্যে লম্বা বেগুন কিনি ৩৮ কি ৪০ টাকায়। রোজা শুরু
হলে বাসার সামনের কাঁচা বাজারির কাছে বেগুনের দাম হাঁকেন ৯০ টাকা। ৩/৪
দিনের ব্যবধানে দ্বিগুণেরও বেশি দাম শুনে আমি তো হতবাক। আবার মিনাবাজারে
দাম জানতে গেলাম। এখানেও দেখি ৮৫ টাকা। কোন দেশে বাস করছি আমরা। আসলে এসব
অনিয়মের বিরুদ্ধে বলার আর ব্যবস্থা নেবার কেউ নেই দেশে। তাই অসাধু
ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে বাজার থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
ওরা রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে আর সাধারণ মানুষ খেয়ে না খেয়ে
কষ্টে আছে।
কি হারে পণ্যমূল্য বেড়েছে তা সরকারি সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব
বাংলাদেশের (টিসিবি) কাছ থেকেই জানা যাক। তাদের তথ্যমতে, ৩০ দিনের
ব্যবধানে ১৪টি নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে। চাল, প্যাকেটজাত আটা ও
পেঁয়াজের কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে যথাক্রমে পাঁচ, এক দশমিক ৬৫ এবং ৪৪ দশমিক
৪৪ শতাংশ। খাসির মাংস ও মুরগির দাম প্রতি কেজিতে বেড়েছে যথাক্রমে পাঁচ
দশমিক ১৭ এবং ছয় দশমিক ২৫ শতাংশ। গত এক মাসে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম
৪৮ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫০ টাকা, আর সরু চালের দাম প্রতি কেজি ৫৮ থেকে বেড়ে
৬৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ভোজ্যতেলের দাম প্রতি লিটার ১২৫ থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা
এবং গরুর মাংস প্রতি কেজি ৫৫০ থেকে বেড়ে ৫৭০ টাকায় পৌঁছেছে। গত এক বছরে
চালের দাম বেড়েছে ২৯ শতাংশ, তেলের ৩৭ শতাংশ। তারপর রোজার রীতি অনুযায়ী
আবার আরেক দফা দাম বেড়েছে বিভিন্ন পণ্যের। সাধারণ মানুষের জন্য সেটা হবে
মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। এমনিতেই করোনার কারণে বেকার হয়েছে বহু মানুষ। আর
চাকরি যাদের আছেও, তাদের আয়-রোজগার কমেছে।
এক জরিপ বলছে, মহামারীতে মানুষের গড় আয় কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। ফলে
বর্তমান দাম যদি স্থিতিশীলও থাকে, তারপরও সাধারণ মানুষের চলা দায় হয়ে
যাবে। এর মধ্যে আরেক দফা মূল্যবৃদ্ধি কোনোমতেই কাম্য হতে পারে না।
পণ্যমূল্য বৃদ্ধির এই লাগামহীন ঘোড়া বর্তমান এবং বিগত সরকারেরও কেউই রোধ
করতে পারেনি। এমনকি সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারও ছিল এক্ষেত্রে
চরম ব্যর্থ। হুমকি-ধমকিতে সব জায়গায় তারা পারঙ্গম হলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে
তারা তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি। তখনও রোজায় নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি বাজার।
মোটকথা হলো- রোজা শুরু হলে যা হওয়ার তাই হয়। আর এ পরিস্থিতি অনেকটা গা
সওয়া হয়ে গেছে আমাদের। পণ্যের দাম এতটাই বাড়ে যে গায়ে সয় কিন্তু পেটে সয়
না। যাদের অনেক টাকা আছে তাদের সয়ে যায় সবই। আর যারা নিম্ন-আয়ের মানুষ
তাদেরই যত জ্বালা। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে লকডাউন। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ
পকেটের অবস্থা অনুসারে কম পণ্য কিনেই বাড়ি ফিরে। লকডাউনে মধ্যবিত্তের
অবস্থাও ভালো নয়। যারা শহরে থাকেন তারা আছেন আরো বিপদে। বাচ্চাদের নিয়ে
ভুখা থাকতে হয় অনেককে। এক বেলা খাবার জোটে তো অন্য বেলা জোটে না।
এবার সিয়াম সাধনার এ মাসটি শুরু হওয়ার আগেই প্রায় সব দ্রব্যের মূল্য
বাড়তে থাকে। তবে পেঁয়াজের দাম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। এটা হয়তো সরকারের
নজরদারিতে বেশি ছিল তাই দাম বাড়েনি ততটা। পণ্য মূল্য এতটাই বেড়েছে যে হাই
প্রেশারের রোগীদের দিন দিন প্রেশার বাড়তে শুরু করেছে। ভোক্তাদের এমন
অবস্থা বাজারের বর্তমান হাওয়া দেখেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় হেন পণ্য নেই যে
গায়ে মূল্যবৃদ্ধির উত্তাপ নেই। তফাৎটা শুধু ডিগ্রির, কোনোটার বেশি,
কোনোটার কম। লকডাউনের ঘোষণা আর রমজান উপলক্ষে কতক বিশেষ পণ্যের চাহিদা
দাঁড়িয়ে যায় বেশি। ভোজ্যতেল, চাল, চিনিসহ সবরকম গরম মসলার চাহিদা বেড়ে
যায়। চাহিদা বাড়ে মাছ, মাংস, দুধের। আর ব্যবসায়ী-মজুতদাররা ধরেই নেয়,
মুনাফায় পকেট ভারি করার মওকাই হচ্ছে সিয়াম সাধনার মাস পবিত্র রমজান।
রমজানে দুটো পয়সা কামিয়ে নিতে এরা কোমর বেঁধে প্রস্তুতি নেয় পূর্বাহ্নেই।
মজুত গড়ে তোলে, দফায় দফায় মূল্য বাড়িয়ে সাধারণ ভোক্তাদের নাভিশ্বাস তুলে
ছাড়ে। সবমিলিয়ে সীমিত আয়ের পরিবারে নিত্যপণ্যের চাহিদা মেটাতে রীতিমতো
হিমশিম খেতে হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারের কার্যকর ভূমিকাও অপ্রতুল।
সঙ্গত কারণে সাধারণ মানুষের হতাশা ও দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছেই।
কয়েক মাস ধরে অহেতুক অস্থির হয়ে পড়ে ভোজ্যতেল, চাল আর চিনির বাজার।
আমদানির ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করা না হলেও আমদানি করা ভোজ্যতেলের দাম
বাড়ান ব্যবসায়ীরা। রমজানকে ঘিরে দুই সপ্তাহ ধরে বাজারে ভোজ্যতেলের
কৃত্রিম সংকটও সৃষ্টি করে আসছেন ব্যবসায়ীরা। অতীতেও দেখা গেছে ব্যবসায়ীরা
সিন্ডিকেট তৈরি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। এসব ব্যবসায়ীর পুরনো কৌশল।
এগুলো যে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে অজানা তাও না। কাজেই সরকারের
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শক্ত হলে বাজার নিয়ন্ত্রণ কেন সম্ভব নয়, তা আমাদের
বোধগম্য নয়। মুষ্টিমেয় কিছু ব্যবসায়ীর জন্য জনসাধারণের জীবনে নাভিশ্বাস
উঠৃেব তা হতে পারে না। অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি কঠোরভাবে রোধ করতে হবে।
বাজার নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ সবার
প্রত্যাশিত। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসমূহের মূল্য স্থিতিশীল রাখার ব্যাপারে
বর্তমান পরিস্থিতিতে যা করা দরকার তা হলো- বাজার নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে
সরকারের নেয়া পদক্ষেপগুলোকে কার্যকর করতে হবে। মধ্যস্থানীয় শ্রেণির
কারসাজি বন্ধ করতে হবে। সরকারকে ব্যবসায়ীদের ওপর বাজার নিয়ন্ত্রণের
নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয়
দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য সামঞ্জস্য আছে কিনা নিয়মিত তা তদারকি করাও জরুরি।
দোকানদারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজদের চাঁদাবাজি বন্ধের ব্যাপারে কঠোর
পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। রমজান মাসে
যেসব পণ্যের চাহিদা বেশি, তা বেশি করে জোগান দিতে হবে। পাইকারি বাজার
থেকে মধ্যশ্রেণির গোষ্ঠী যাতে স্বার্থ হাসিল না করতে পারে, সেজন্য
পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত সরকারি নিজস্ব পরিবহন ও জনবলের
মাধ্যমে খুচরা বাজারে পণ্যসামগ্রী পৌঁছে দেয়া যেতে পারে। তাতে
চাঁদাবাজদের চাঁদাবাজিও বন্ধ হবে। বেশি করে পণ্য আমদানি করে সুষ্ঠুভাবে
তা বণ্টন করা।
সর্বোপরি আরো বেশি করে সরকারি বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করে সুষ্ঠু ও
স্বচ্ছভাবে বণ্টনের ব্যবস্থা করা। সর্বোপরি ব্যবসায়ীদের পবিত্র মাহে
রমজানের পবিত্রতা অনুধাবন করা জরুরি। পণ্যসামগ্রী মজুতের মাধ্যমে
অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন থেকে বিরত থাকার শপথ নিতে হবে।

লেখক- মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button