ফিচার

মুকুল রায় এর স্মৃতিচারণ || আমার বাবা

 

(মনে পড়ে, বাবার মৃত্যুর পরে শোক প্রকাশ করার জন্য গ্রামের বাড়িতে গিয়ে প্রখ্যাত সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দীন বলেছিলেন – কত জায়গায় ঘুরেছেন তিনি, দেখা হয়েছে কত রকম বিচিত্র মানুষের সাথে – কিন্তু বাবার মত একজন জ্ঞানী ঋষিতুল্য মানুষ যে এই রকম এক অজগ্রামে থাকতে পারেন, তা তার চিন্তারও বাইরে ছিল; এ রকম দুটি মানুষের দেখা তিনি কোথাও পান নাই…, একদিনের প্রোগ্রামে এসে তিনি বাবার জন্য থেকে গেছেন দিনের পর দিন। উল্লেখ্য যে, মেজদা গোকুল রায় দৈনিক “সংবাদ”-এর সাংবাদিক হওয়ার সূত্রে তিনি মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে গিয়ে কয়েকদিন করে থেকে যেতেন আর বাবার সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করে কাটিয়ে দিতেন।

সেদিন শোক প্রকাশের সময় মোনাজাত ভাই জানিয়েছিলেন যে, বাবাকে নিয়ে তিনি লিখবেন, কারণ তার মত বিরল প্রকৃতির মানুষকে নিয়ে লেখা উচিৎ। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, মোনাজাত ভাইয়ের অকাল প্রয়াণ বাবাকে নিয়ে তার লেখার সব পথ রুদ্ধ করে দিয়ে গেছে। আজ বাবাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে মোনাজাত ভাইয়ের সেসব কথা মনে পড়ে গেল…..।)

 

“দোর্দন্ড প্রতাপশালী” শব্দটির মানে বুঝতাম আমার বাবাকে দেখে। এলাকায় তার সে কি প্রতাপ। তার কথায় গ্রামের সমাজ উঠছে, বসছে।

তাকে ছাড়া সমাজে কোন সামাজিক কাজ হয় না, হয় না বিচার শালিস। সব সময় বাড়িতে মানুষজনের ভীড় লেগেই আছে। আজ একাজে, তো কাল অন্য কাজে সদা ব্যস্ত।

মনে পড়ে,সেই শৈশবে কোন এক শালিসে যাবেন না বলাতে একজন তার পা জড়িয়ে ধরে কি কান্না – রাজী না হওয়া পর্যন্ত সে পা আর ছাড়েন না।

ছাত্রজীবনে বাবা ছিলেন যুক্তিবাদী তার্কিক। আমাদের হিন্দু প্রধান এলাকায় ধর্মীয় গুরুগিরি ব্যবসা করার সাহস পেত না হিন্দু ধর্মীয় গুরুরা। যুক্তিবাদী নিরীশ্বরবাদি বাবার সামনে কোন যুক্তিতে টিকতে পারতেন না তারা। এমন ঘটনার কথাও শুনেছি যে, রাতে ধর্ম নিয়ে যুক্তিতর্কে হেরে গিয়ে ধর্মীয়গুরু শিষ্যবাড়ি ত্যাগ করে মন্ত্রদান বাদ দিয়ে চলে গেছেন ভোরে। এ জন্য গ্রামের কিছু ধর্মপ্রাণ মানুষ সব সময় অসন্তষ্ট ছিলেন তার প্রতি।

বাবার কথা ছিল – মানুষই ঈশ্বরকে তৈরি করেছে নিজ প্রয়োজনে, ঈশ্বরের প্রয়োজনে নয়।
বাবার ধার্মিক মামা নাকি তর্কে হেরে গিয়ে বলেছিলেন যে, ধার্মিকদের মরণ হবে সুখের মরণ, অপরদিকে বাবার মত নিরীশ্বরবাদীদের মরণ হবে কষ্টের মরণ ; কারণ, মরণের সময় ধর্মিকদের মনে এই ভরসা ক্রিয়াশীল থাকবে যে, মরণের পরে ওপারে তার জন্য ভগবান অভয়ের হাত বাড়িয়ে আছেন, সুতরাং ঈশ্বর বিশ্বাসীদের ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পন করে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলার এক ভরসাস্থল আছে ; কিন্তু অবিশ্বাসীদের জন্য তো পরপারে এ রকম কোন আশ্রয়স্থল নাই, ভরসার স্থল নাই। তাদের জন্য ওপারে কোন আশ্রয়ের জায়গা না থাকায় তাদের মরণ হবে খুব কষ্টের মরণ।
বাবা এসব বলতেন আর হাসতেন।

বাবা ছিলেন এক কর্মী মানুষ। গ্রামে একটার পর একটা স্কুল করেছেন, মেয়েদের শিক্ষার চেষ্টা করেছেন, হিন্দু বিধবাদের বিবাহ দিয়েছেন সবার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, মানুষের বিপদে আপদে সাহায্য করেছেন, আমাদের পাড়ায় এখন যারা আছেন, তাদের প্রায় সবারই পূর্বপুরুষদেরকে জমি দিয়ে, ঘরবাড়ি তুলে দিয়ে আশ্রয় দিয়েছেন, কুলাঘাট জুনিয়র হাই স্কুল গড়ে তুলে অবৈতনিক শিক্ষক হিসেবে শিক্ষাদান করে গেছেন, সাপটানায় নয়াহাটে স্কুল ও কলেজ তৈরিতে অবদান রেখেছেন, গ্রামে তার তৈরি স্কুলগুলো একসময় বন্ধ হয়ে গেলেও গ্রামের একটি প্রাথমিক স্কুল আজ সরকারি হয়েছে।

অনর্গল ইংরেজি, সংস্কৃত শ্লোক বলতে পারতেন বাবা। সারাদিন পড়াশুনা নিয়ে থাকতেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকেও সময় করে নিয়ে পড়তেন।

বাড়িতে ছিল একটি ছোট পারিবারিক লাইব্রেরি। ছিল হারমোনিয়াম, সেতার, এস্রাজসহ গানবাজনার যন্ত্রপাতি, ছিল কলেরগান। বাড়িতে ছিল তুষ কাগজে হাতে লেখা চর্যাপদ – কাঠের ফ্রেমে বাঁধা।
প্রথমজীবনে তার তিন মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করতে না পারলেও মোটামুটি শিক্ষিত করে বিয়ে দিলেও ছোট মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করে তুলেছেন, আমাদেরকে উচ্চ শিক্ষা দিয়েছেন, তার ছোট মেয়েসহ আমরা তিন সন্তান প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা, আর এক ভাই জেলার সাংবাদিকতার পথিকৃত, সিনিয়র সাংবাদিক।

আমৃত্যু লড়েছেন সামাজিক আর ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, নারী শিক্ষার পক্ষে। বলতেন – “যতদিন মৃত্যু আছে, মৃত্যুভীতি আছে, ততদিন পৃথিবীতে ধর্মের আর ঈশ্বরের দাপট থাকবে, সাধারণ মানুষ ঈশ্বর মানবে। যেদিন মানুষ মৃত্যুকে জয় করবে, সেদিন ঈশ্বরের রাজত্ব শেষ হবে। কত বড় নির্মোহ দার্শনিক পর্যবেক্ষণ, ভাবতেও এখন অবাক লাগে।

ধর্মের নামে শোষণ, অত্যাচার, বোকা বানানো ভুল বোঝানো প্রতিরোধ করেছেন তিনি। বলতেন – “কাঠাল গাছ আম গাছ নিজেই খাড়া হয়ে উপরে উঠে যায়, তার কোন সাহায্যকারীর প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু লাউ কুমড়া গাছ নিজে দাঁড়াতে পারে না, তাদের উপরে ওঠার জন্য অন্যের সাহায্য নিতে হয়। তোমরা লাউ কুমড়া গাছ হবে কেন, আম কাঠাল গাছ হও। স্বশিক্ষিত হও,।” তিনি বলতেন – ধর্ম ধীরে ধীরে অত্যন্ত সন্তর্পনে এক সময় মানুষকে ‘মানুষ’ থেকে ‘হিন্দু’, ‘মুসলিম’, ‘খৃষ্টান’ বানিয়ে দেয়।

বাবা স্ট্রোক করে মাস দুয়েক বিছানায় শয্যাশায়ী থেকে মারা যান। শেষের দিকে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে সবাই ঈশ্বরের দিকে ঝুঁকে পড়েন, ঈশ্বরকে ডাকতে থাকেন, তা যত বড় নাস্তিকই হোন না কেন। আমার হঠাৎ একদিন মনে হল – আচ্ছা, বাবার মনে কি এখনও যৌবনের সেই “ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ণ”-মূলক দৃঢ়তা আছে?

বিষয়টি জানার প্রবল ইচ্ছা হল আমার। আমি বাবার কানের কাছে মুখ নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম – “বাবা, এখন আপনার কি মনে হয়? ভগবান আছেন, না কি নাই..”?

আশেপাশের সবাইকে অবাক করে দিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বাবা এপাশে ওপাশে কাৎ করে না সূচক মাথা নাড়িয়ে জানালেন যে, না, ভগবান নাই…।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *