শোক সংবাদ /জাহাঙ্গীর হোসেন

রফিক সুলায়মান || তৌফিক স্যার : স্মৃতিতে, প্রীতিতে গাঁথা

‘ছ ফুট পানিতে ডোবা আর আটলান্টিকে ডোবা একই কথা। সত্য হলো মৃত্যু।’

‘কাফনের কোন পকেট নাই।’

‘নিজের জন্য যা করি এটা রুটিন ওয়ার্ক। অন্যের জন্য যা করি সেটাই আনন্দ।’

– এমন সুন্দর সুন্দর করে অনুপ্রেরণামূলক কথা বলতেন তৌফিক স্যার। তাঁর সঙ্গে ১০ মিনিট সময় কাটানো অনেক আনন্দের উপলক্ষ্য হতো। তিনি ছিলেন জ্ঞানভাণ্ডার। শিল্পকলা পছন্দ করতেন। অনেক অনেক শিল্পকর্ম সংগ্রহ করেছেন। নবীন শিল্পীদের উৎসাহ দিতেন।

আর কিছুক্ষণ পর তিনি সাড়ে তিন হাত ছোট্ট ঘরে প্রবেশ করবেন। গতকাল ভোরে কাতার থেকে তাঁর মরদেহ ঢাকায় আসার পর থেকে স্থানীয় একটি হাসপাতালের হিমঘরে আছেন।

তিনি ভবন নির্মাণ ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত থাকলেও আদ্যোপান্ত একজন মানবিক মানুষ ছিলেন। আমার ২৬ বছরের পর্যবেক্ষণ যদি এক লাইনে লিখতে বলে হয় তাহলে আমি বললো : ‘পরিবার পরিজনদের জন্য তিনি ছিলেন দীপশিখা আর কর্মক্ষেত্রে সকলের জন্য এক বাতিঘর।’ আমি জানি প্রায় সকলেই আমার এই বক্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করবেন।

আজ এই বিশেষ মুহূর্তে আমার বন্ধু রিপনকে খুব মিস করছি। সে এখন সিংগাপোরে, মাউন্ট এলিজাবেথে স্ত্রীর চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে আটকে গেছে। তৌফিক স্যারের অন্তিম যাত্রায় সে পাশে থাকতে পারছে না, এটা ভাবতেই আমার হৃদয় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। ২০১২ সালে ফটোফি যখন রিপনকে সংবর্ধনা দেয় সেখানে তৌফিক স্যার ছিলেন প্রধান অতিথি আর আমি ছিলাম প্রধান বক্তা। অনুজের সংবর্ধনায় অগ্রজ প্রধান অতিথি – এমন বিরল ঘটনার সাক্ষী হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। এছাড়া রিপনের সবগুলো ফটোগ্রাফি শোতে কোন না কোনভাবে তৌফিক স্যার জড়িয়ে থাকতেন।

অনেক স্মৃতি অনেক ঘটনা মনে আসছে। ঢাকা ৪০০ চিত্রকলা এলবামের প্রকাশ মুহূর্ত কিংবা স্যারের লেখা আরবান প্ল্যানিং গ্রন্থের সম্পাদনা, এক সাথে কাঠমাণ্ডু ভ্রমণের স্মৃতি। মনীষা কইরালা এবং তৌফিক স্যারকে এক মঞ্চে বসানো – সব স্মৃতি মনে পড়ছে আজ। কাঠমাণ্ডুর অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ চলে গেলে মোমবাতি দিয়ে কাজ সারতে হয়েছিলো। এই অভূতপূর্ব বিপত্তি তৌফিক স্যার খুব উপভোগ করেছিলেন। গত মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে ঝরা খালার জানাজায় অনেক কথা বলার পর হঠাৎ বললেন, আচ্ছা রফিক সিঙ্গাপোরে তোমাদের কোন সমস্যা হয় নি তো! আমি বললাম, সব ওকে ছিলো। শুধু ফেরার দিন একটু ঝামেলা হয়েছিলো তানি ভাবীর হুইল-চেয়ার নিয়ে। স্যার হেসে বললেন, ‘এটাই শুনতে চেয়েছি। রফিক থাকবে আর বিপত্তি হবে না – এটা কিভাবে সম্ভব।’

তিনি প্রনস এবং আমাদের ইউটিউব চ্যানেল নিয়েও উচ্ছ্বসিত ছিলেন। প্রনসের অনেক প্রোগ্রাম শেলটেক ও এনভয়ের সৌজন্যে আয়োজিত হয়েছে। অনেক ঋণ তাঁর কাছে আমার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *