সংস্কৃতি / বাপ্পি সাহা

শিল্পী পারভীন সুলতানা এন্ড ফ্রেন্ডস’ – এর মিলনমেলা

শেষ শরতের টিপ টিপ বৃষ্টি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকা শহরের অতিরিক্ত ট্র্যাফিক জ্যাম চিরাচরিত। স্লিপারি রাস্তায় গাড়ির ভিড় ঠেলে ঠেলে গুলশান ১-এ লেক তীরবর্তী একটি আধুনিক ইমারতের পঞ্চদশতলায় কমিউনিটি রুমে প্রনস সদস্যদের উপস্থিত হতে সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা পার হয়ে যায়। উপলক্ষ্য ছিল ‘শিল্পী পারভীন সুলতানা এন্ড ফ্রেন্ডস’ শিরোনামে প্রনস-মিলনী।

আয়োজনটা ছিল জাঁকজমকপূর্ণ। মিলনায়তনে প্রবেশ করেই পাই পারভীন আপা এবং মিস্টার পারভীন আপা অর্থাৎ ইতরাত ভাইয়ের উষ্ণ অভ্যর্থনা। এরপরেই দারুণ স্বাদের সিঙ্গারা সমুচা দিয়ে জলযোগ। এরপর ব্যালকনিতে গিয়ে সবার মনটা যেন আরও ফুরফুরে লাগলো। শরতের সন্ধ্যারাতের আকাশে শুক্লাপক্ষের দ্বাদশীর চাঁদ। সমুখে ঢাকার বিশাল আলো আঁধারির দিগন্ত। দূরে বিটিভির ট্রান্সমিশন টাওয়ারে উপরে লালবর্ণের সিগনাল বাতি যেন বলছে – এই শহরে আমিও আছি তোমাদের সাথে। কমবেশি পঞ্চাশ মিটার নিচে গুলশান লেক। আর একটু দক্ষিণে হাতির ঝিল। লেকের দুপারে এবং হাতির ঝিলের মাঝখানে চলমান যান্ত্রিকযানের হেডলাইট লেকের জলে প্রতিফলনে অপরূপ আলোকমালার সৃষ্টি করেছে। শাহজাহান পাটোয়ারী ভাই আর ডাঃ গুলজার হোসেন উজ্জ্বল প্রায় একই সাথে বলে উঠলেন – মনে হয় আমরা লন্ডনে টেমসের পারে দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় শুরু হলো নূরুস সাফা স্যার আর রফিক সুলায়মান ভাইয়ের হাতে ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দ। সবাই মেতে উঠলো ফটোসেশনে – একক ছবি, দলবদ্ধ ছবি, ডুয়েট ছবি, গ্রুপ ছবি, সেলফি সব রকম কম্বিনেশনে।

ততক্ষণে মঞ্চের উপর তবলায় টোকা দিয়ে বি-ফ্লাট সি-শার্প মেলাচ্ছেন তবলিয়া বশির আহমেদ ভাই। মঞ্চের ডানদিকে বিশাল সাইজের রোল্যান্ড এক্সবি কী-বোর্ডের রিডে ডাবলু ভাইয়ের দশটি আঙ্গুল সঞ্চালনে সুরের আবাহন। আর তার ডানদিকে নাসির ভাই স্প্যানিশ গিটারের তারে স্ট্রোক দিয়ে আমন্ত্রণ জানালেন – এখন যে সময় হলো সঙ্গীতের।

অতিথিবৃন্দ সহ প্রনস-এর সদস্যরা একে একে মিলনায়তনে আসন নিলেন। মাইক্রফোন হাতে নিলেন প্রনসএর প্রধান এডমিন রফিক সুলায়মান ভাই। তাঁর আহবানে মঞ্চে আসলেন অনুষ্ঠানের হোস্ট প্রনস উপদেষ্টা পারভীন সুলতানা। রফিক ভাই জানালেন, পারভীন আপার একটা গান ইউটিউবের এইচ. আর. চ্যানেলে আপলোড করার পর এযাবৎ সর্বাধিক আটলক্ষ ভিউ হয়েছে। বিষয়টি আমাদের দেশের সঙ্গীতাঙ্গনে একটি ল্যান্ডমার্ক । এই সফলতার উচ্ছ্বাসের ফল সবার আবদারে পারভীন সুলতানা আয়োজন করলেন প্রনস-মিলনী অনুষ্ঠান। পারভীন আপা সেই গানটি পরিবেশনার মাধ্যমে শুরু হলো আনুষ্ঠানিক সেলিব্রেশন। গানটি ছিল জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়’।

এরপর মঞ্চে আসলেন শিল্পী শাহজাহান পাটোয়ারি। তিন প্রথমে পরিবেশন করলেন নজরুলের – ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাবো, তবু আমারে দেবো না ভুলিতে’ এবং পরে শরতকে বন্দনা করে ‘শারদ নিশির হিমেলা বাতাস’ নজরুল সঙ্গীতটি ।

এই পর্যায়ে আর্টিস্ট হোসেন ফারুকের আঁকা পারভীন সুলতানার একটি প্রট্রেট অঙ্কনশিল্পী নিজ হাতে পারভীন আপাকে উপহার দেন।

এরপরে মঞ্চে আসলেন শিল্পী রেবেকা সুলতানা। তিনি প্রথমে গাইলেন নজরুলের একটি কাব্যগীতি ‘মোরে ডেকে লও সেই দেশে, প্রিয় যেই দেশে তুমি থাকো’। রেবেকা আপার শেষের গানটি দিয়ে আসর মাতিয়ে দিলেন। গানটি ছিল কবি নজরুলের কাফি ঠাটের রাগরাগিণী সম্বলিত ‘নীলাম্বরী শাড়ী পরি’ নীল যমুনায় কে যায়’।

এরপর অনুষ্ঠান সঞ্চালক প্রনস আহবায়ক প্রকৌশলী নূরুস সাফাকে আগেভাগে না জানিয়ে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানিয়ে সবাইকে চমক দিলো আর বিব্রত করলো সাফা স্যারকে। সরস সাফা সাহেব কিন্তু শ্রোতাদের নিরাশ করলেন না । হঠাৎ আহবানের রেশ কাটতে না কাটতে তিনি প্রথমে গাইলেন রবীন্দ্র সঙ্গীত ‘ তোমার সুর শুনায়ে যে ঘুম ভাঙাও সে ঘুম আমার রমণীয় ’। জলদ গম্ভীর কণ্ঠে তিনি আর একটি রবীন্দ্র সঙ্গীত পরিবেশন করলেন ‘ঝড়ে যায় উড়ে যায় গো আমার মুখের আঁচল খানি’। দ্বিতীয় গানে হারমোনিয়াম বাজিয়ে তাঁকে সহযোগিতা করলেন স্থপতি নাজমা খান।

দুটো হারনো দিনের গান নিয়ে এরপরে মঞ্চে আসলেন শিল্পী নাহিদ মোমেন। তিনি প্রথমে গাইলেন আবু হেনা মোস্তফা কামালের লেখা এবং আব্দুল আহাদের সুরকরা পুরনো দিনের একটি জনপ্রিয় গান‘ আমি সাগরের নীল নয়নে মেখেছি’ । তাঁর দ্বিতীয় অর্থাৎ শেষ গানটি ছিল গৌরিপ্রসন্ন মজুমদারের কথা এবং অমল মুখোপাধ্যায়ের সুরে হসপিটাল ছবিতে গীতা দত্তের সেই বিখ্যাত গান ‘ এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায় একি বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু’।

এরপর একটু অন্যরকম পরিবেশনা। ‘প্রনস-মিলনী’ অর্থাৎ ‘শিল্পী পারভীন সুলতানা এন্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠান নিয়ে এই অভাজন ১০ অক্টোবর বিকেলে একটি কবিতা লিখে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলো। প্রকৌশলী শাহজাহান পাটোয়ারী সেই পোস্টের উপর কয়েকছত্র ছান্দসিক মন্তব্য দিয়েছিলেন। প্রনস প্রধান এডমিন রফিক সুলায়মান সেই কাব্যটি মন্তব্যসহ ছন্দে ছন্দে পরিবশন করলেন।

এরপর আবার চমক। জোর জবরদস্তি করে মঞ্চে উঠানো হলো গান বন্ধু গোলাম ফারুক ভাইকে। অনেক না না করেও তিনি গাইলেন রবীন্দ্রনাথের ‘সব দিবি কে সব দিবি পায়, আয় আয় আয়’। দীর্ঘ করতালির মাধ্যমে দর্শক শ্রোতা তাঁর গানের তারিফ করলেন, তাঁকে দেখালেন সম্মান।

এরপরে নজরুল সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য মঞ্চে আসলেন ডাঃ গুলজার হোসেন উজ্জ্বল। তাঁর প্রথম গানটি ছিল ‘ সখি সে হরি কেমন বল’ । এরপর তিনি কৌশিক কানাড়া রাগে তেওড়া তালে নজরুলের একটি স্বল্পশ্রুত গান ‘আমার মা যে গোপাল সুন্দরী’ পরিবেশন করেন।

অনুষ্ঠানে অন্যতম অতিথি ছিলেন ডিপার্টমেন্ট অব আর্কিটেকচারের প্রধান স্থপতি শামীম আমিনুর রহমান। সঞ্চালকের একান্ত অনুরোধে তিনি পরিবেশন করলেন একটি নজরুল সঙ্গীত ‘মম বনভবনে ঝুলন দোলনা দে দোলায়ে’।

এরপরে বিপাশা গুহঠাকুরতা মিশ্র তিলককামোদ রাগের উপর নজরুলের ‘সোনার হিন্দোলে কিশোর কিশোরী’ গানটি পরিবেশন করেন ।

 

এরপর আবার চমক। আগে জানান না দিয়ে আচমকা মঞ্চে আহবান জানানো হলো অনুষ্ঠানের হোস্ট ইতরাত সাহেবকে। উপস্থিত অনেকেই জানতেন না শিল্পী পারভীন সুলতানার সহধর্মী ইতরাত হোসেন ভাই একজন ভালো কণ্ঠশিল্পী। তিনি প্রথমে গাইলেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে শ্যামল গুপ্তের সেই বিখ্যাত গান ‘ বনের পাখি গায় বোল না বোলনা‘। এরপর তিনি পারভীন আপার সাথে ডুয়েট গাইলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘ময়ূর কন্ঠী রাতের নীলে’ গানটি। দুটো গানই দর্শক শ্রোতাদের যুগপৎ বিস্ময় ও আনন্দ দিয়েছে।

শচীন কত্তার একটিও গান অনুষ্ঠানে থাকবে না তা কি হয়। শিল্পী ফেরদৌসী রহমান চন্দন গাইলেন মীরা দেব বর্মনের লেখা শচীন দেব বর্মনের সেই জনপ্রিয় গান ‘বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে হৃদয়ে দিয়েছো দোলা/ রঙেতে রাঙিয়া রাঙাইলে মোরে একি তব হরি খেলা’।

কবি ও কণ্ঠশিল্পী মহুয়া বাবর এরপরে মঞ্চে এসে গাইলেন কমল দাশগুপ্তের সুর করা নজরুলের ‘মনে পড়ে আজ সে কোন জনমে’।

প্রনস-মিলনী সঙ্গীতানুষ্ঠানটি শুরু করেছিলেন পারভীন সুলতানা আপা । সবশেষে তিনি আসলেন র‍্যাপ-আপ করতে। তবে এবার নজরুল সঙ্গীতে না গিয়ে তিনি তিনটি হারানো দিনের গান পরিবেশন করলেন। প্রথমটি ছিল পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় মান্না দে’র সুরে আশা ভোঁসলের গাওয়া ‘যখন আকাশটা কালো হয়’ । এরপর তিনি গাইলেন হৈমন্তী শুক্লার অল্পশ্রুত একটি গান ‘কিছু মনে থাকেনা’। তাঁর কন্ঠে তৃতীয় এবং আসরের সর্বশেষ গানটি ছিল গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের লেখা এবং নচিকেতা ঘোষের সুরে গীতা দত্তের অসীম জনপ্রিয় ‘ নিশিরাত বাঁকা চাঁদ’ – যদিও আকাশে তখন দ্বাদশীর শুক্লা চাঁদ বাঁকা নয় পূর্ণবৃত্তের দিকে ধাবমান।

পুরো অনুষ্ঠানটি যন্ত্রসঙ্গীত দিয়ে সহায়তা করেছেন লিড গিটারে নাসির ভাই, কি-বোর্ডে ডাবলু ভাই এবং তবলায় বশীর ভাই।

সঙ্গীতানুষ্ঠানের পর আড়ম্বরপুর্ণভাবে কেক কেটে সবাই প্রনস-এর অগ্রযাত্রার জন্য কন্ঠে প্রার্থনা সুর তুললেন। দোয়া করা হলো ইতরাত ভাই-পারভীন সুলতানা দম্পতির জন্য।

অনুষ্ঠানের সব শেষে ছিল ডিনার। টেবিলে গিয়ে দেখা গেলো তুলকালাম কাণ্ড। সারি সারি ফুড ওয়ার্মার ট্রেতে সাজানো বর্ণ গন্ধে সমৃদ্ধ দৃষ্টিনন্দন সব খাবার । ইংরেজিতে যাকে বলে সাম্পচুয়াস ফুড। আহারে, সে কী আয়োজন! পরের দু’দিন সপ্তাহপ্রান্তের ছুটি থাকায় র‍্যালিশ করে ভোজনে কারও আপত্তি ছিল না। হোমমেড কালোজাম, বোঁদে আর দ্বি-স্তর বিশিষ্ট পুডিং দিয়ে হলো মধুরেণ সমাপয়েৎ।

বিদায় বেলায় সবার কন্ঠে একটা কথাই প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল ‘ আজকের এমন সুন্দর স্বর্ণালি সন্ধ্যাটি আমাদের মনে থাকবে অনেক দিন, অনেকগুলো বছর’।

 

লেখকঃ দিলীপ গুহঠাকুরতা

অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, উপদেষ্টা প্রনস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *